ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৩১ আগস্ট) এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৬০ ডলারে ওঠে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
রোববার (৩০ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব স্থাপনা থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন বসানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ওই হামলায় কয়েকজন ইরানি সেনা ও বেসামরিক ব্যক্তি হতাহত হয়েছেন।
এরপর ইরান জর্ডানে থাকা মার্কিন বাহিনীর দুটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা অচলাবস্থায় থাকায় এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে সমুদ্রপথে বিশ্বে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। সংঘাতের প্রভাবে সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৃশ্যমান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দিনে প্রায় পাঁচটিতে নেমে আসে। তবে নিরাপত্তার কারণে কিছু জাহাজ স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখায় প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়ামও বাড়তে পারে।
তবে তেলের দামের পরবর্তী গতিপথ শুধু সামরিক উত্তেজনার ওপর নির্ভর করবে না। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি আলোচনা, ইরানের তেল রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলোও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক উত্থানের পরও আগস্টে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের মাসিক গড় দাম কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে। ফলে সোমবারের মূল্যবৃদ্ধি সংঘাতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলেও তেলের বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের অন্যান্য বিষয়ও প্রভাব ফেলছে।
এদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। আরও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের তেল বিক্রি, বৈদেশিক আয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হলে এর প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তেলের পাশাপাশি জাহাজ পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। তেলের বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে সংঘাতের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপর।


