নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। একই ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। রোববার (৩০ আগস্ট) পাওয়া সর্বশেষ হিসাবে নেপালে ৭৩৪ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপালে নিখোঁজের সংখ্যা ২ হাজার ৪৯৮ জন। তাঁদের মধ্যে ৩১টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। অন্যদিকে তিব্বতের গিরং এলাকায় ৫৪৬ জন নিখোঁজ, যাঁদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি। তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে নেপালের ১০৪, ভারতের ৪৯, লাটভিয়ার ৩৩, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ এবং যুক্তরাজ্যের ১৫ নাগরিক রয়েছেন।
দুর্যোগের পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু এবং নদীর পানি আবারও বাড়ার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
রাসুয়া জেলায় ভোতেকোশী নদীর পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে সতর্কতা জারি করেছে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। এতে উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
উদ্ধার অভিযানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের বের করে আনা। ত্রিশুলি-৩এ ও ত্রিশুলি-৩বি প্রকল্পের বিভিন্ন টানেলে এখনো শতাধিক মানুষ আটকা থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের একটি টানেলে শনিবার রাতে ছোট পাইপ স্থাপন করে ভেতরে বাতাস পাঠানো শুরু করেছে নেপাল সেনাবাহিনী। এরপর শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে খননকাজ শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুঙ জানিয়েছেন, টানেলে বাতাস পৌঁছানোর পর উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। আটকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নেপালের অনুরোধে চীনও এই অভিযানে সহায়তা করছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে শ্রমিকদের উদ্ধারে নয়জন চীনা বিশেষজ্ঞ নেপালি দলের সঙ্গে কাজ করছেন। ধসে যাওয়া ও কাদায় বন্ধ হয়ে থাকা টানেলে কীভাবে প্রবেশ করা যায়, তা নির্ধারণে তাঁরা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।
তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকাতেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। সীমান্তমুখী সড়কের অনেক অংশ দুই মিটার পর্যন্ত কাদায় ঢেকে গেছে এবং কিছু জায়গায় সড়কের মাটি পুরোপুরি ধুয়ে গেছে। ভারী যন্ত্রপাতি ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে সেখানে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছাতে চীন ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। তিব্বতের সামরিক কমান্ড খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী ও উদ্ধার সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য দুটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে।
ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে নদীর গতিপথ আটকে একাধিক অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হওয়ায় নতুন বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। একটি বাধা অনেকটা সরে যাওয়ায় নদীর পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং তাৎক্ষণিক হ্রদভাঙার ঝুঁকি কমেছে বলে জানিয়েছে চীনের জলবিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ। তবে ধসে পড়া হিমবাহের কাছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটারের আরেকটি জলাধার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঝুলন্ত বরফের স্তরে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন ভূমিধস বা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই নিখোঁজদের ছবি নিয়ে ঘুরছেন এবং তালিকায় স্বজনদের নাম খুঁজছেন। অন্যদিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শশীর খানাল জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ভারী সরঞ্জাম, বিশেষায়িত প্রযুক্তি এবং মরদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে, নিখোঁজ ৫১৭ বিদেশির মধ্যে পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নেপাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা স্যাটেলাইট ও নদীর পানির তথ্য ভাগাভাগি নিয়েও আলোচনা করেছেন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত নেমে এসে নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা দেখা দেয় এবং সড়ক, সেতু, বসতি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা ও উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তবে এবারের নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা ছিল, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
নেপাল ও তিব্বতে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কার মধ্যে উদ্ধারকারীদের দ্রুততার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।


