ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব করেছে সরকার। একই সঙ্গে ভবনের মালিক নিজে বিনিয়োগ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন, অথবা তৃতীয়পক্ষের সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ রাখা হচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে এভাবে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে নেট মিটারিংয়ের আওতায় গ্রিডে সরবরাহ করা সৌরবিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) জানিয়েছে, ৩৩ কেভি ভোল্টেজে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর ১০ টাকা ৯ পয়সা। সৌরবিদ্যুতের প্রস্তাবিত দর ১০ টাকা ৫০ পয়সা হলে প্রতি ইউনিটে ৪০ পয়সা ঘাটতি থাকবে। এ ঘাটতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ডিপিডিসির হিসাব অনুযায়ী, ২৫ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দিনে চার ঘণ্টা উৎপাদন করলে মাসে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এর ৪০ শতাংশ গ্রিডে সরবরাহ করা হলে পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ ইউনিট। এ হিসাবে প্রতি ইউনিটে ৪০ পয়সা ঘাটতি ধরলে মাসিক ভর্তুকির প্রয়োজন হবে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রণোদনা চালু হলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিংয়ের বিস্তার দ্রুত হতে পারে।
এ বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগে একটি যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরই মধ্যে দেশজুড়ে সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলো।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ ভবনের মালিক চাইলে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবেন, আবার সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নীতিগতভাবে এগোচ্ছে সরকার। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের ন্যায্য প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের হিসাব ও প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে মোট ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী ছয় মাসের জন্য আরও ২১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থা ও প্রণোদনা কাঠামো পর্যালোচনা করে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের বিপরীতে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের হার নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে নেট মিটারিং প্রকল্পের আওতায় আরও ১ হাজার নতুন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। এসব ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নেট মিটারিংয়ের শুরুতে ৫০০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ৫ হাজারের বেশি প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে ৩৪১ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। আগামী পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ১০ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিনিউয়েবল এনার্জি এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আল মাহমুদ মনে করেন, সরকারের প্রস্তাবিত উদ্যোগ সৌরবিদ্যুৎ খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, প্রণোদনা দেওয়া হলে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। সরকারি পাইকারি দর যেখানে প্রায় ১৩ টাকা, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে ভবনের ছাদ ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ক্যাবল অপারেটর ও নেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের মতো করেই সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটানো সম্ভব। সার্ভিস প্রোভাইডাররা বিনিয়োগ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং মাস শেষে বিল আদায় করবে। এ ব্যবস্থায় অঞ্চলভিত্তিকভাবে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।


