নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভূমিধসে তৈরি অস্থায়ী হ্রদের পানি উপচে পড়ায় নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে নদীর ভাটিতে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নেপালের রাসুয়া ও চীনের তিব্বত অংশে উদ্ধার তৎপরতাও সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির বরাতে জানা গেছে, ভূমিধসে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার পর সীমান্তের কাছে অস্থায়ী হ্রদটির সৃষ্টি হয়। সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে ছিল। এখন পানি উপচে পড়ায় হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে গেলে প্রবল জলস্রোত ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় চীনা উদ্ধারকারী দল ও তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই কারণে নেপালের রাসুয়া এলাকাতেও উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়। নদীতীরবর্তী এলাকার কিছু বাসিন্দাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু ও নিরাপদ জায়গার দিকে যেতে দেখা গেছে।
হ্রদের বর্তমান অবস্থা বুঝতে চীনা বিশেষজ্ঞরা ড্রোনের সাহায্যে নজরদারি চালাচ্ছেন। হ্রদের আকার, পানির পরিমাণ এবং আশপাশের ভূখণ্ডের ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
এর আগে বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়। এতে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
চীনের তিব্বত অংশেও বন্যা ও ভূমিধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪৬৮ জন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
নতুন করে হ্রদের পানি উপচে পড়ায় নদীর ভাটিতে থাকা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। বিশেষ করে নেপালের রাসুয়া জেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পানি, পলি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে দ্বিতীয় দফায় বড় বন্যা তৈরি করতে পারে।
প্রথম দফার দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযানও নানা বাধার মুখে পড়েছে। বন্যায় বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে গেছে। আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া, আহতদের উদ্ধার এবং জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনী রাসুয়া এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা প্রায় ১০০ মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম অঞ্চলে এখনো অনেকের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
চীনের তিব্বত অংশেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার অভিযান তদারক করেছেন। সেখানে জরুরি কর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর ও নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ ধস বা ভূমিধসের পর নদীর গতিপথে ধ্বংসাবশেষ জমে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হলে সেটি পরবর্তী দুর্যোগের কারণ হতে পারে। এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পানি, পলি ও পাথরের স্রোত নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তবে এবারের হিমবাহ ধসের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
প্রথম দফার ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সামলে ওঠার আগেই অস্থায়ী হ্রদের পানি উপচে পড়ায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বন্যা মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জোরদার রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


