নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আগেই নতুন করে বড় ধরনের ঢলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহের ধ্বংসাবশেষে তৈরি হওয়া একটি ব্যারিয়ার হ্রদ দ্রুত পানিতে পূর্ণ হয়ে উঠছে। সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলায় চীন তিব্বতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে সীমিত করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর সংযোগস্থলের কাছে হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে এবং পানি উপচে পড়ছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি হ্রদটিতে জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আকস্মিক ঢল নামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, নতুন হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার এবং গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ মিটার। পানি কমানোর জন্য সম্ভাব্য স্থানে নিষ্কাশন নালা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করছে চীন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল মোতায়েন করা হয়েছে। তারা আকাশপথে জরিপ চালানোর পাশাপাশি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে বাঁধ ভেঙে গেলে পানির সম্ভাব্য গতিপথ নির্ধারণ করছেন।
২৬ আগস্টের ভয়াবহ দুর্যোগের পর হিমবাহ ধস এবং বিপুল পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ায় এই নতুন ব্যারিয়ার হ্রদের সৃষ্টি হয়। পরে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পানি ও কাদা ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে। আকস্মিক ওই ঢলে নেপালের রাসুয়া ও আশপাশের এলাকা এবং তিব্বতের গিরংয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ওই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এপির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পর্যন্ত নেপালে ৪৬৯ জন নিহত এবং ৯৭৭ জন নিখোঁজ ছিলেন। তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ৫১৭ জনের বেশি। তাদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার নাগরিক রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গিরং এলাকায় নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি।
বন্যা ও ভূমিধসে রাস্তা, সেতু এবং সীমান্ত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নেপাল ও চীনে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দল কাজ করলেও নতুন হ্রদ থেকে সম্ভাব্য ঢলের ঝুঁকিতে তিব্বতে উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উদ্ধারকাজ সীমিত রাখার কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
এর মধ্যে গিরং সীমান্ত এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে পাহাড়ের মাটি ও পাথর আরও অস্থিতিশীল হয়ে নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ার পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে হ্রদটির পানিপ্রবাহের সর্বোচ্চ চাপ তৈরি হতে পারে। তাই পানির স্তর, প্রাকৃতিক বাঁধের স্থায়িত্ব এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য বন্যার পথে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের নিরাপদ স্থানেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।


