নেপাল-তিব্বতে বন্যা-ভূমিধসে নিহত ৪৭২, নিখোঁজ ১,৪৬৮

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৪৭২ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ৪৬৯ জন নেপালের এবং তিনজন চীনের তিব্বত অঞ্চলের। একই সঙ্গে দুই এলাকায় এখনো ১ হাজার ৪৬৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নেপাল পুলিশ ও চীনের সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব পাওয়া গেছে।

বুধবার হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির ব্যাপক স্রোত নেমে আসে। এতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে সীমান্তবর্তী বহু গ্রাম, ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

নেপালে নিখোঁজ রয়েছেন ৯১০ জন। দেশটির কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভ্রমণকারীরা এই তালিকায় রয়েছেন।

নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন নাগরিকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং এলাকায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। ওই এলাকায় তিনজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালের ৯১০ জন নিখোঁজের সঙ্গে তিব্বতের এই সংখ্যা যোগ করলে দুই অঞ্চলে মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৮।

তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও পর্যটন কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিখোঁজের সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। উদ্ধারকাজ ও পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা সামনে আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছানোই এখন উদ্ধারকারীদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বন্যার স্রোতে বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থল যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আহতদের সরিয়ে নেওয়া, নিখোঁজদের খোঁজ এবং দুর্গত এলাকায় খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে প্রায় ১০০ মানুষ আটকা পড়েছেন। ওই এলাকা থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। টানেলে থাকা অন্যদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে বন্যার ধ্বংসাবশেষে নদীর প্রবাহ আটকে কয়েকটি স্থানে জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব এলাকায় পানির চাপ বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাবে, হিমবাহ ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহই এই দুর্যোগের কারণ। প্রথম দিকে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প মনে করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে এটি হিমবাহ ধসজনিত ভূকম্পন ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

তিব্বতের গিরং এলাকাতেও উদ্ধার অভিযান চলছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেছেন। প্রায় ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর ও দ্রুতগতির নৌযান সেখানে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে।

দুর্যোগের সময় কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় থাকা বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও বিপদের মধ্যে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে পড়া কয়েকজনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধ সড়কগুলো সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারলে দুর্যোগটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top