গ্যারি সোবার্সের ছয় ছক্কার দিনে ইতিহাসে অমর ম্যালকম ন্যাশ

ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের এক ম্যাচে। এক ওভারের ছয় বলে ছয় ছক্কা মেরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন নটিংহামশায়ারের অধিনায়ক গ্যারি সোবার্স। আর সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন গ্ল্যামারগনের ২৩ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার ম্যালকম ন্যাশ।

ঘটনাটি সেন্ট হেলেন্স, সোয়ানসিতে গ্ল্যামারগন ও নটিংহামশায়ারের ম্যাচে। পয়েন্ট তালিকায় নটিংহামশায়ার তখন পঞ্চম স্থানে। ম্যাচটি জিতলে চতুর্থ স্থানে ওঠার সুযোগ ছিল তাদের। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত এক বাজিও ছিল সোবার্সের। হেরে গেলে দিতে হতো এক কেস শ্যাম্পেন।

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা নটিংহামশায়ার ৩০৮ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর দ্রুত আরও রান তুলতে চেয়েছিল। দিনের বাকি সময়ে গ্ল্যামারগনের ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলতে ইনিংস ঘোষণার আগে স্কোর বাড়ানো দরকার ছিল। সেই পরিস্থিতিতেই বল হাতে ন্যাশকে দেখা যায় ভিন্ন ভূমিকায়। পেস বোলিং ছেড়ে তিনি স্লো লেফট-আর্ম স্পিন করার পরীক্ষা করছিলেন।

পরে ন্যাশ জানিয়েছিলেন, সোবার্সই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি ধীরগতির বাঁহাতি স্পিন করতে চান কি না। কিন্তু সেই পরীক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ নতুন ভূমিকায় ন্যাশের প্রথম ওভারই তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের আলোচনায় নিয়ে আসে। গ্ল্যামারগনের অধিনায়ক টনি লুইসের অবশ্য স্মৃতিচারণে ঘটনার পেছনে ন্যাশের নিজের আগ্রহের কথাও উঠে এসেছে।

সোবার্স তখন দ্রুত রান তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজের আউট হওয়ার চিন্তা না করে ইনিংস ঘোষণা করার আগে যতটা সম্ভব রান বাড়ানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ন্যাশের বলে খুব বেশি টার্ন ছিল না, আর লেগ সাইডের বাউন্ডারিও তুলনামূলক ছোট ছিল।

প্রথম বলেই মিডউইকেটের ওপর দিয়ে ছক্কা মারেন সোবার্স। দ্বিতীয় বলও পাঠান গ্যালারিতে। তৃতীয় বল কিছুটা অফে সরিয়েও ন্যাশ রেহাই পাননি, লং অনের ওপর দিয়ে সেটিও ছক্কা হয়ে যায়।

চতুর্থ বলে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। সোজা বল পেয়ে সোবার্স পুল করেন ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ দিয়ে। বল কংক্রিটের দেয়ালে আঘাত করে ফিরে আসে। তখনই তাঁর মাথায় এক ওভারে ছয় ছক্কার সম্ভাবনা আসে। গ্যালারিতেও শুরু হয়ে যায় একটাই স্লোগান, ‘সিক্স, সিক্স, সিক্স’।

পঞ্চম বলটি ছিল স্লোয়ার। সোবার্সের শট ঠিকমতো টাইমিং না হলেও লং অফে রজার ডেভিসের হাতে বল জমে যায়। কিন্তু বাউন্ডারি লাইনের বাইরে গিয়ে ভারসাম্য রাখতে পারেননি তিনি। কিছুক্ষণ অনিশ্চয়তার পর আম্পায়াররা আলোচনা করে ছক্কার সিদ্ধান্ত দেন। ফলে ইতিহাস থেকে তখন আর মাত্র এক বল দূরে সোবার্স।

শেষ বলের আগে লুইস প্রায় সব ফিল্ডারকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দেন, বিশেষ করে লেগ সাইডে। সোবার্স অনুমান করেছিলেন ন্যাশ এবার আরও জোরে বল করবেন। বলটি শর্ট ও দ্রুতই আসে। পেছনের পায়ে ভর করে মিডউইকেটের ওপর দিয়ে সেটি আকাশে তুলে দেন সোবার্স। বল মাঠ পেরিয়ে কিং এডওয়ার্ড রোড পর্যন্ত গড়িয়ে যায়।

সেই বলটিই পরে এক স্কুলপড়ুয়া ছেলে কুড়িয়ে ফেরত দিয়েছিল। বলটি এখনো ট্রেন্ট ব্রিজের জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ছয় বল, ছয় ছক্কা, আর ক্রিকেটে তৈরি হলো এমন এক রেকর্ড, যা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে সে সময়কার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটেও প্রথম ছিল।

সোবার্সের ছয় ছক্কার আগে ছয় বলের এক ওভারে সর্বোচ্চ রান ছিল ৩২। ১৯৬৫ সালে ট্রেন্ট ব্রিজে নটিংহামশায়ারের বিপক্ষে লেস্টারশায়ারের ক্লাইভ ইনম্যান এবং ১৯৩২ সালে কার্ডিফে হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে গ্ল্যামারগনের সিরিল স্মার্ট ৩২ রান করেছিলেন। আর ১৯১১ সালে হোভে সাসেক্সের বিপক্ষে নটিংহামশায়ারের টেড অ্যালেটসন এক ওভারে ৩৪ রান করলেও সেই ওভারে ছিল দুটি নো বল।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top