নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৩৩ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নেপালেই মারা গেছেন ৬২৬ জন। তিব্বতের গিরং এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও সাতজন। একই সঙ্গে দুই অঞ্চলে এখনো ২ হাজার ৪৭৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৯২৪ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও রাশিয়ার নাগরিক রয়েছেন।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৬১৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চিতওয়ান ও নওয়ালপরাসি পূর্বসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রবল নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কয়েকজনের মরদেহও দুর্গম এলাকা থেকে উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকারীরা।
তিব্বতের গিরং এলাকায় সাতজনের মৃত্যুর পাশাপাশি ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। নেপালের ১ হাজার ৯২৪ জনের সঙ্গে এই সংখ্যা যোগ করলেই দুই অঞ্চলে নিখোঁজের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৭৮।
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে। নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় উদ্ধারকারীরাও ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান করছেন। তবে পাহাড়ি দুর্গম এলাকা এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
নেপালের ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি বন্যাকবলিত টানেলেও বহু মানুষ আটকা পড়েছেন। কাদার পুরু স্তরে টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনী সেখানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েক শ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে বের করে আনা হয়েছে। ভেতরে থাকা অন্যদের উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে নদীর গতিপথ আটকে অস্থায়ী একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় ভাটির এলাকাগুলোতে ঝুঁকি তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে নেপাল ও চীনের কয়েকটি এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ ও আশপাশের অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্র দেখা গেছে। সেখানে চীনা উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজ করছেন।
আন্তর্জাতিক রেডক্রসের তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রয়োজন বাড়ছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ নেপালে বিদেশি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নেপাল জানিয়েছে, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ পরিচালনার সক্ষমতা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর রয়েছে। বিশেষায়িত কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হলে বিদেশি সহযোগিতা নেওয়া হবে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত থেকেই বন্যার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণেও প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হওয়া কম্পনের সঙ্গে হিমবাহ ধসের সম্পর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এবারের নির্দিষ্ট হিমবাহ ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
উদ্ধার অভিযান ও মরদেহ শনাক্তের কাজ চলতে থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারলে দুর্যোগটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


