চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে জ্বালানি আমদানি ও বিল পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রাথমিকভাবে সৌরশক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাজেটে বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এখন উদ্যোক্তাদের সৌরশক্তিতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিদ্যমান সংকট একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, এ জন্য সময় প্রয়োজন। জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানোর বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সহজ না হলেও সরকার এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে সরকার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বলেও জানান তিনি। শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ সহায়তা পাবে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না বলে স্পষ্ট করেন অর্থমন্ত্রী।
কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এ ক্ষেত্রে অটোমেশনের বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রচলিত উৎসের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর সুফল শিগগিরই পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
সেমিনারে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় পার করছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসার বদলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানো এবং সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর জোর দেন তিনি।
খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান হোসেন জিল্লুর রহমান। অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকিতে ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পিআরআই চেয়ারম্যান জায়েদি সাত্তার নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে থাকা ব্যবধান কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। উচ্চ শুল্কের কারণে স্থানীয় বাজারে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কর আহরণ বাড়াতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের সম্ভাবনা কম বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সেমিনারে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন। আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকের তারল্য, বিনিয়োগ, সুদহার, খেলাপি ঋণ, বন্দর ও কাস্টমস সেবার দক্ষতা নিয়েও মতামত উঠে আসে।


