লিবিয়ার দীর্ঘ ৪২ বছরের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটে ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর। বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে পালানোর চেষ্টা করে রাস্তার পাশের একটি নর্দমার পাইপে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হয়। পরে বন্দী অবস্থায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, নাকি গোলাগুলির মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়, তা নিয়ে আজও প্রশ্ন রয়েছে।
গাদ্দাফির পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী বাহিনী। ন্যাটোর বিমান হামলায় তাঁর গাড়িবহর ধ্বংস হওয়ার পর পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদন্তে তাঁকে আটকের পর নির্যাতন ও গুলি করে হত্যার জোরালো প্রমাণের কথা উঠে আসে। তাঁর মৃত্যুর ১৫ বছর পরও লিবিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরেনি।
১৯৪২ সালে লিবিয়ার সিরতে অঞ্চলে একটি বেদুইন পরিবারে জন্ম গাদ্দাফির। তখন দেশটি ইতালির উপনিবেশ ছিল। শৈশব থেকেই আরব জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। বিশেষ করে মিসরের তৎকালীন নেতা জামাল আবদেল নাসেরের রাজনৈতিক দর্শন তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। আরব ঐক্য, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা ও পশ্চিমা প্রভাবমুক্তির ধারণা তাঁর রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর কয়েকজন তরুণ কর্মকর্তাকে নিয়ে লিবিয়ার রাজতন্ত্র উৎখাতের পরিকল্পনা করেন গাদ্দাফি। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। ওই সময় লিবিয়ার বাদশাহ সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিস বিন মুহাম্মদ আল মাহদি তুরস্কে ছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দেখভালের দায়িত্বে থাকা তাঁর ভাইপো যুবরাজ সাইদ হাসান-উর-রিদা আল-মাহদিকে গৃহবন্দী করা হয়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে ক্যাপ্টেন থেকে কর্নেল হন গাদ্দাফি।
ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি বন্ধের উদ্যোগ নেন তিনি। পাশাপাশি দেশের তেলসম্পদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করেন। এসব পদক্ষেপের কারণে আরব বিশ্বের অনেকের কাছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়া তেলসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়। তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় ‘দ্য গ্রিন বুক’ বা ‘সবুজ বই’-এ। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিন খণ্ডে প্রকাশিত বইটিতে পশ্চিমা সংসদীয় গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত ঘরানার কমিউনিজমের সমালোচনা করা হয়। এর পরিবর্তে আরব জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ইসলামি নীতির সমন্বয়ে একটি বিকল্প ব্যবস্থা তুলে ধরেন তিনি।
জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলতেন গাদ্দাফি। এ ধারণার ভিত্তিতে দেশের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘গ্রেট সোশ্যালিস্ট পিপলস লিবিয়ান আরব জামাহিরিয়া’। তবে বাস্তবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গাদ্দাফি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মত দমন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়নের অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ত্রিপোলির প্রাসাদে শত শত নারীকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
বিদেশ সফরের সময় প্রচলিত হোটেলের বদলে বেদুইন তাঁবুতে থাকার জন্য পরিচিত ছিলেন গাদ্দাফি। তাঁর সশস্ত্র নারী দেহরক্ষীদের দল ‘অ্যামাজোনিয়ান গার্ড’ নামে পরিচিত ছিল। পোশাকের ক্ষেত্রেও প্রচলিত রীতি অনুসরণ করতেন না তিনি। কখনো সামরিক পোশাক, কখনো রঙিন আফ্রিকান পোশাক, আবার কখনো নিজস্ব নকশার পোশাকে তাঁকে দেখা যেত।
আফ্রিকার দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ছিল গাদ্দাফির। আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় তিনি বড় অঙ্কের অর্থায়ন করেন এবং সংগঠনটির নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইউনিয়নের মোট বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ লিবিয়া দিত। ২০০৮ সালে ইথিওপিয়ায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচনের আগে ২০০ জনের বেশি আফ্রিকান রাজা ও আদিবাসী নেতা তাঁকে ‘আফ্রিকার রাজাদের রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘ সময় বৈরী ছিল। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থনসহ বিভিন্ন কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৮২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং দেশটির তেলশিল্পে প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের আকাশে একটি যাত্রীবাহী বিমানে বিস্ফোরণে ২৭০ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় গাদ্দাফির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে এবং লিবিয়াকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়। ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লিবিয়া ওই হামলার দায় স্বীকার করে এবং নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়। একই বছর গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা দেয় গাদ্দাফি সরকার। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
গাদ্দাফির পতনের সূচনা হয় ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময়। তিউনিসিয়া ও মিসরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর লিবিয়ার বেনগাজিতেও তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ দমনে গাদ্দাফি সরকার সামরিক শক্তি ব্যবহার করলে পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। একপর্যায়ে জাতিসংঘ গাদ্দাফিবিরোধী ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে সমর্থন দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সমর্থনে এবং ন্যাটোর সামরিক সহায়তায় বিদ্রোহীরা অভিযান শুরু করে।
২০১১ সালের আগস্টে বিদ্রোহী বাহিনী রাজধানী ত্রিপোলিতে প্রবেশ করে এবং শহরের বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২৩ আগস্ট তারা গাদ্দাফির সদর দপ্তর আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড দখল করে। এরপর সিরতে শহরে তাঁর অনুগত বাহিনী শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
২০ অক্টোবর ভোরে গাদ্দাফি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা গাড়িবহর নিয়ে সিরতে থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। পথে ন্যাটোর বিমান হামলায় বহরের গাড়িগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। এতে অনেকে নিহত হন। গাদ্দাফি ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী বেঁচে গেলেও শেষ পর্যন্ত পালাতে পারেননি।
আহত অবস্থায় রাস্তার পাশের একটি নর্দমার পাইপে আশ্রয় নেন গাদ্দাফি। বিদ্রোহীরা এলাকাটি ঘিরে ফেলে তাঁকে পাইপের ভেতর থেকে টেনে বের করেন। পরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে ঘিরে রেখেছেন উত্তেজিত যোদ্ধারা। কেউ তাঁকে টানছেন, কেউ ধাক্কা দিচ্ছেন, আবার কেউ মুঠোফোনে ঘটনাটি ধারণ করছেন।
গাদ্দাফির মৃত্যুর সঠিক পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের প্রধান মাহমুদ জিবরিল সে সময় বলেছিলেন, বিদ্রোহী ও গাদ্দাফির অনুগত বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদন্তে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, পাইপ থেকে বের করার পর গাদ্দাফিকে মারধর করা হয় এবং একটি গাড়ির ওপর তোলা হয়। আটকের পর নির্যাতন এবং বন্দী অবস্থায় গুলি করে হত্যার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায় বলে সংস্থাটি জানায়। একই দিন আটক অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর ছেলে মুয়াতাসিম গাদ্দাফিরও।
মৃত্যুর পর গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতা শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বিপণিবিতানের শীতলীকরণ কক্ষে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য মরদেহ রাখা হয়েছিল।
গাদ্দাফির মৃত্যুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। তিনি বলেছিলেন, লিবিয়ার মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, তবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হবে না। পরবর্তী পরিস্থিতি সেই চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও লিবিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশটি এখনো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাসনকেন্দ্রে বিভক্ত। পশ্চিমাঞ্চলের ত্রিপোলিভিত্তিক সরকার এবং পূর্বাঞ্চলে খলিফা হাফতারের সমর্থনপুষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ক্ষমতার বিরোধ চলছে। ২০২০ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ থামলেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়ে গেছে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেশটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে শেষ মুহূর্তে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়েও এ বিষয়ে সমাধান হয়নি।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের এক জনমত জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩২ শতাংশ লিবীয় মনে করেন, ২০১১ সালের বিপ্লবের পর তাঁদের দেশ আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। কয়েক বছর আগে লিবিয়ার শিক্ষাবিদ মুস্তফা ফেতোউরিও ইউরোনিউজকে বলেছিলেন, গাদ্দাফির শাসনামলের সঙ্গে তুলনা করলে দেশটিতে এখন কোনো স্থিতিশীলতা নেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা, আরব নিউজ, রয়টার্স, বায়োগ্রাফি ডটকম, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, দ্য গার্ডিয়ান


