নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এবার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে ভারতের বিহার রাজ্যে। নেপালের রসুয়া জেলা ও তিব্বতের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ নেমে আসা কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোতে কয়েকটি জনপদ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে পৌঁছেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি পর্যটক এবং ৪৪ জন নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন।
বুধবার সকালে নেপালের ভোটকোশি নদীর শাখা লেন্দেতে হিমবাহ ধসে একটি কৃত্রিম বাঁধ তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নেমে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো আগাম সতর্কতা বা স্থানীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত ছাড়াই স্রোতটি হঠাৎ জনবসতির দিকে ধেয়ে আসে।

রসুয়া জেলার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানা জানান, শুরুতে বিকট শব্দ ও তীব্র কম্পনে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলে মনে হয়েছিল। পরে দেখা যায়, প্রায় ১০০ মিটার উঁচু কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোত দ্রুত এগিয়ে আসছে। প্রায় এক মিনিটের মধ্যেই তিমুরে বাজার ও আন্তর্জাতিক সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। কাস্টমস পয়েন্টে থাকা ৩০০টির বেশি পণ্যবাহী ট্রাক ও গাড়িও স্রোতে ভেসে যায়।
এই পাহাড়ি ঢলের প্রভাব নিচের দিকের স্যাফ্রুবেসি ও নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক সরকারি হিসাবে, ১৯টি মোটরচালিত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক নদীগর্ভে চলে গেছে। ধ্বংস হয়েছে ৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা। ভোটকোশি নদীর ওপর স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় বন্যা-নিয়ন্ত্রণ স্টেশনগুলোরও ক্ষতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৩ সালে সারলাহি ও রাউতাহাটে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর পর এটি নেপালের অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে।
সীমান্ত এলাকার একটি হোটেলে থাকা এক ভারতীয় পর্যটক জানান, বিশাল কাদার স্রোত চোখের সামনে এগিয়ে আসতে দেখেছেন তারা। স্রোতটি হোটেলের প্রায় ১০ ফুট পাশ দিয়ে গেলেও তাদের গাড়ি ও কয়েকজন সহযাত্রী ভেসে যায়।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, দুর্যোগে ১০ হাজারের বেশি পরিবারের জরুরি খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ও আকাশপথে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এদিকে নেপাল থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ পানি ও কাদার প্রভাবে ভারতের বিহারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কোশি ও গণ্ডক নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পশ্চিম চম্পারণসহ ছয়টি জেলায় হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী প্রায় ১ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল সরকার ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো নগদ অর্থ সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নগদ অর্থের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। নেপাল সরকারের জন্য খোলা তহবিলটি উদ্ধার, চিকিৎসা, ত্রাণ ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত এবং এতে প্রশাসনিক ব্যয় করার সুযোগ নেই।


