দারুল উলুম দেওবন্দকে ঘিরে নতুন বিতর্ক, উঠছে উসকানির অভিযোগ

ভারতের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দকে ঘিরে সম্প্রতি একাধিক বিতর্কিত ঘটনা সামনে এসেছে। রশীদ মসজিদে শিবলিং থাকার দাবি তুলে সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর ‘হিন্দু রক্ষা দল’-এর পক্ষ থেকে হরিদ্বার থেকে গঙ্গার পানি এনে দারুল উলুমের প্রাঙ্গণে ঢালার ঘোষণাও দেওয়া হয়।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পথেই আটকে দেয়। ফলে দারুল উলুমের প্রাঙ্গণে গিয়ে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়নি এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি। তবে ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে উসকানিমূলক প্রচারণা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দারুল উলুম দেওবন্দ নিয়ে কোনো অভিযোগ বা ঐতিহাসিক দাবি থাকলে তা যাচাই ও নিষ্পত্তির জন্য ভারতের আদালত ও আইনি কাঠামো রয়েছে। অভিযোগের সমাধান রাজপথের কর্মসূচি বা অন্য ধর্মের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে করার সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দারুল উলুম দেওবন্দকে ঘিরে নতুন বিতর্ক, উঠছে উসকানির অভিযোগ

১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৮৫৭ সালের পর ভারতের মুসলমানদের শিক্ষাগত ও সামাজিক সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে একটি ছোট মক্তব থেকে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বহু আলেম, মুফতি, শিক্ষক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানীসহ দেওবন্দের সঙ্গে যুক্ত বহু আলেম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন এবং কারাবরণসহ নানা ত্যাগ স্বীকার করেন।

দারুল উলুমের চিন্তাধারা বা শিক্ষা নিয়ে মতপার্থক্য ও সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার পক্ষে প্রমাণ প্রয়োজন। মতাদর্শগত সমালোচনা এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে বারবার সন্দেহ বা বিতর্কের কেন্দ্রে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে একই বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দেওবন্দে ২০০৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বসবাসের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে লেখক দাবি করেছেন, স্থানীয় বাস্তবতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা বক্তব্যের চেয়ে ভিন্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক, সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ক বিদ্যমান এবং দারুল উলুমের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গেও স্থানীয় মানুষের সম্পর্ক রয়েছে।

লেখায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকার কথা উল্লেখ করে লেখায় বলা হয়েছে, কোনো ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে উসকানি তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

এ অবস্থায় মুসলমানদের, বিশেষ করে তরুণদের, উসকানিতে আবেগপ্রবণ না হয়ে ধৈর্য ও আইনানুগ পথে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলনে এর সঙ্গে যুক্ত আলেমদের ভূমিকা এবং শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে প্রতিষ্ঠানটির অবদান সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে জানার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

লেখাটির মূল বক্তব্য হলো, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও উসকানির পরিবর্তে আইন, সংবিধান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দারুল উলুম দেওবন্দকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই বৃহত্তর প্রশ্নই সামনে এনেছে যে, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তার সমাধান কতটা আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে করা হচ্ছে।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top