আকাশে উড্ডয়নের পরও ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে বিকল্প লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জনের দাবি করেছে ইরান। দেশটির দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক গাইডেন্স ব্যবস্থা ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
১০ আগস্ট কাজভিন শহরে এক অনুষ্ঠানে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি ইরানের এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এখন শুধু নির্ধারিত একটি স্থান থেকে উৎক্ষেপণ করে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর অস্ত্র নয়; বরং উড্ডয়নের সময়ও প্রযুক্তিগতভাবে এর গতিপথ ও লক্ষ্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে। এ কারণে দীর্ঘপাল্লার রাডার ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এর সম্ভাব্য পতনস্থল অনুমান করে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সুযোগ পায় প্রতিপক্ষ। ইরানের দাবিকৃত নতুন প্রযুক্তি বাস্তবে কার্যকর হলে এই পূর্বানুমানের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের পর নিয়ন্ত্রণ পাখনা বা থ্রাস্টার ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ও দিক পরিবর্তন করা সম্ভব হলে প্যাট্রিয়ট, থাড কিংবা ইসরায়েলের অ্যারোর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন হতে পারে। তবে এই সক্ষমতার বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
আকাশে থাকা অবস্থায় নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের সক্ষমতা বাস্তবায়নে উন্নত ডেটালিঙ্ক, স্যাটেলাইট নেভিগেশন, অ্যান্টি-জ্যামিং প্রযুক্তি ও উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। এমন প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়তে পারে।
ইরানের ফাত্তাহ-১, ফাত্তাহ-২, খাইবার শেকান ও খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রে আগে থেকেই গতিপথ পরিবর্তনের প্রযুক্তি যুক্ত থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলা করে উড্ডয়নের মাঝপথে ক্ষেপণাস্ত্রকে সম্পূর্ণ নতুন কোনো দূরবর্তী লক্ষ্যে সফলভাবে পরিচালনা করা কতটা সম্ভব, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তেহরান এ বিষয়ে কোনো ফ্লাইট টেস্টের তথ্য বা ভিডিও প্রকাশ করেনি।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, ইরানের ঘোষিত সক্ষমতাটি হয়তো সম্পূর্ণ নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের পরিবর্তে আগে থেকেই নির্ধারিত বিকল্প লক্ষ্য ব্যবহারের প্রযুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ মূল লক্ষ্যে আঘাত করা সম্ভব না হলে ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্বনির্ধারিত দ্বিতীয় কোনো লক্ষ্য নির্বাচন করতে পারে।
এই প্রযুক্তির দাবি সত্য হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ও থাডের মতো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনামূলক উচ্চ ব্যয়ের কারণে ড্রোন, ডিকয় ও বিভিন্ন ধরনের ম্যানুভারেবল ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহারের পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর মোতায়েন করতে হতে পারে।
তবে ইরানের এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। প্রযুক্তিটি সত্যিই নতুন মাত্রার সক্ষমতা তৈরি করেছে, নাকি এর কিছু অংশ প্রচারণামূলক দাবি, তা নির্ধারণে আরও পরীক্ষার তথ্য প্রয়োজন।


