বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুই দল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে সেমিফাইনালে নামছে দুই পরাশক্তি।
একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে থমাস টুখেলের অধীনে আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত ইংল্যান্ড। সব মিলিয়ে ড্যালাসের এই লড়াই ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।
কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের প্রতিপক্ষকে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছে দুই দলই। নরওয়েকে পরাজিত করে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ইংল্যান্ড। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডকে বিদায় জানিয়ে আরেকবার ফাইনালের খুব কাছে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের অপেক্ষায় গোটা ফুটবল বিশ্ব।

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত রেকর্ড
বিশ্বকাপের শেষ চারের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার ইতিহাস সত্যিই ঈর্ষণীয়। এখন পর্যন্ত তারা পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেছে এবং প্রতিবারই জয় নিয়ে ফাইনালে উঠেছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এখনো পরাজয়ের মুখ দেখেনি আলবিসেলেস্তেরা।
এই রেকর্ড এবারও ধরে রাখতে চাইবে লিওনেল স্কালোনির দল। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ফেরার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে ইংল্যান্ড। টুখেলের অধীনে দলটি ধারাবাহিকভাবে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছে, যা তাদের সমর্থকদের আশাবাদী করে তুলেছে।
মুখোমুখি লড়াইয়ে কারা এগিয়ে?
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সামান্য এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড।
- মোট ম্যাচ: ১৪
- ইংল্যান্ডের জয়: ৬
- আর্জেন্টিনার জয়: ৩ (টাইব্রেকারসহ)
- ড্র: ৫
বিশ্বকাপের আসরেও দুই দলের দেখা হয়েছে পাঁচবার। সেখানে তিনটি ম্যাচ জিতেছে ইংল্যান্ড, আর দুটি ম্যাচে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে সংখ্যার বাইরে এই দ্বৈরথের মূল্য আরও বেশি, কারণ প্রায় প্রতিটি ম্যাচই ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় অমর কয়েকটি ম্যাচ
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়, বরং আবেগ, নাটকীয়তা এবং স্মরণীয় সব ঘটনার সমাহার।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনা দুটি অবিস্মরণীয় গোল করে ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করেন। প্রথমটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, আর দ্বিতীয়টি অসাধারণ একক প্রচেষ্টায় করা সেই বিখ্যাত গোল, যেটিকে এখনো অনেকেই ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ বলে মনে করেন। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াই গড়ায় টাইব্রেকারে। নির্ধারিত সময়ে ২-২ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচে শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। একই ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম।
অন্যদিকে ২০০২ বিশ্বকাপে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। বেকহ্যামের পেনাল্টি থেকেই আসে ম্যাচের একমাত্র গোল, যা ইংলিশদের ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেয়।
দুই দলের শক্তি কোথায়, কারা হতে পারেন পার্থক্য গড়ে দেওয়া ফুটবলার?
সেমিফাইনালের মতো বড় ম্যাচে ছোট ছোট মুহূর্তই ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। তাই আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড—দুই দলই নিজেদের সেরা একাদশ এবং কার্যকর কৌশল নিয়ে মাঠে নামবে।
ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক হ্যারি কেন। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করতেও তিনি সমান দক্ষ। মাঝমাঠে জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইংলিশদের বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণে রয়েছেন লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ। অভিজ্ঞতা ও গতির এই সমন্বয় যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। রক্ষণে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর দৃঢ় উপস্থিতি দলটিকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
ম্যাচে কী ধরনের লড়াই দেখা যেতে পারে?
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো সাধারণত সতর্কতার সঙ্গে শুরু হয়। এই সেমিফাইনালেও দুই দল শুরু থেকেই অযথা ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
মাঝমাঠের দখল এবং বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রথম গোলটি যে দল করবে, তাদের মানসিক সুবিধা অনেকটাই বেড়ে যাবে। তাই শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় থাকতে পারে দুই দল।
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাচের ফল না-ও আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কখন শুরু হবে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচ?
বিশ্বকাপের এই বহুল প্রতীক্ষিত সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৬ জুলাই।
ম্যাচের সময়সূচি
- তারিখ: ১৬ জুলাই
- বাংলাদেশ সময়: ১৫ জুলাই দিবাগত রাত ১টা
- ভেন্যু: ড্যালাস, যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য গভীর রাতের এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোথায় সরাসরি দেখা যাবে ম্যাচ?
বাংলাদেশের দর্শকরা টেলিভিশন ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ম্যাচটি উপভোগ করতে পারবেন।
টেলিভিশনে টি স্পোর্টস, বিটিভি এবং সময় টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা রয়েছে।
অনলাইনে ম্যাচ দেখা যাবে টফি, আইস্ক্রিন, বায়োস্কোপ, স্পোর্টজফাই এবং ক্রিকফাই টিভির মতো প্ল্যাটফর্মে। এছাড়া কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজেও লাইভ স্ট্রিম দেখা যেতে পারে।
ইতিহাসের নতুন অধ্যায় নাকি পুরোনো ধারার পুনরাবৃত্তি?
আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে নিজেদের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ধরে রাখতে পারবে, নাকি ইংল্যান্ড দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে—সেই উত্তর মিলবে ড্যালাসের মাঠে।
দুই দলের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশ্বকাপের স্মরণীয় ইতিহাস এবং ফাইনালে ওঠার লড়াই মিলিয়ে এই ম্যাচটি এবারের আসরের অন্যতম আলোচিত সেমিফাইনাল হয়ে উঠেছে। ফুটবলপ্রেমীদের দৃষ্টি এখন পুরোপুরি এই মহারণের দিকে।


