যুদ্ধের আগুনে পুড়তে পুড়তে মাঠে ইরানের নারী ফুটবলাররা, জাতীয় সংগীতে নতুন বার্তা

মাঠে খেলা চলছে, কিন্তু মন পড়ে আছে হাজার মাইল দূরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে। পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, ইন্টারনেট বন্ধ, আর বুকের ভেতর চাপা উদ্বেগ।

এই অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান কাপ খেলছে ইরানের নারী ফুটবল দল। আর তাদের জাতীয় সংগীতের সময়কার প্রতিক্রিয়া এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।

দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচে নীরবতা — প্রতিরোধ না শোক?

গত সোমবার এশিয়ান কাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ইরানের নারী ফুটবলাররা জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন। কোনো ব্যাখ্যা দেননি তারা।

তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এটি ছিল হয় প্রতিরোধের প্রতীক, নয়তো দেশে চলমান সংঘাতে প্রাণহানির প্রতি শোক প্রদর্শন। সেদিন তারা ৩-০ গোলে হেরে মাঠ ছাড়েন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ইরান একা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মোকাবিলা করছে। যুদ্ধ পুরোদমে শুরু হওয়ার আগেই দলটি টুর্নামেন্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়া রওনা হয়েছিল। এরপর থেকেই দেশের পরিস্থিতির খবর তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে ভারী করে তুলছে।

অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ভিন্ন চিত্র

দুই দিন পর বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য দেখা গেল। ইরানের নারী ফুটবলাররা এবার সমস্বরে জাতীয় সংগীত গাইলেন এবং শেষে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিলেন।

একই দলের একই মাঠে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে এই পরিবর্তন কেন এলো, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে, যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রতি সংহতি প্রকাশই ছিল এই স্যালুটের পেছনের বার্তা।

গ্যালারিতে বিক্ষোভ, মাঠে চোখের জল

অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের সময় গ্যালারি ছিল উত্তাল। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দর্শকদের একাংশ দুয়ো দিতে থাকেন। কেউ কেউ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ইরানের পতাকা নিয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। কিছু দর্শক আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে ব্যানার ধরে স্লোগান দেন।

মাঠের ভেতরে পরিস্থিতি আরও মর্মস্পর্শী ছিল। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে ইরানের স্ট্রাইকার সারা দিদার কান্নায় ভেঙে পড়েন। দেশে থাকা পরিবার ও বন্ধুদের জীবনের ঝুঁকির কথা ভাবতেই তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ কেউই দেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

কোচের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা

এই কঠিন পরিস্থিতিতে ইরানিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান সমর্থকদের উপস্থিতি দলকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছে। কোচ মারজিয়া জাফারি অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াকে জানান, প্রবাসী ইরানিয়ানদের সমর্থন তাদের আবেগাপ্লুত করেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, দেশের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকাটা দলের সবার জন্যই কষ্টকর।

তার ভাষায়, দল পেশাদারিত্বের সঙ্গে মাঠে নামতে চায় এবং পরের ম্যাচে মনোযোগ ধরে রাখতেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন এখনো জীবিত

দুই ম্যাচ হেরে ইরান এখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। তবে এখনো শেষ হয়ে যায়নি সব। রোববার ফিলিপাইনসের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয় পেলে গ্রুপের সেরা তৃতীয় দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।

ইতোমধ্যে এই গ্রুপ থেকে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া শেষ আটে জায়গা নিশ্চিত করেছে। তবে শুধু টুর্নামেন্ট জেতাই নয়, এই এশিয়ান কাপ থেকেই ব্রাজিলে আসন্ন বিশ্বকাপের টিকিট মিলবে।

সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কোচ জাফারির দল মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে — হৃদয়ে যুদ্ধের ক্ষত নিয়েও।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top