প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা। গাজায় চলমান অভিযান, লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে একাধিক দফায় সংঘাতে ইসরায়েলি বাহিনী ইতিমধ্যে ক্লান্ত
এই পরিস্থিতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ দেশটির জন্য কতটা টেকসই হবে, সে প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
বোমার আতঙ্কে বিপর্যস্ত ইসরায়েলি নাগরিক জীবন
গত শনিবার ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলকে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে। দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি হচ্ছে, স্কুল বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে জরুরি তলব করতে হয়েছে।
হাইফা ও তেল আবিবের মতো বড় শহরগুলো টানা হামলার মুখে পড়ছে। যে মাত্রার যুদ্ধ ইসরায়েলি সরকার অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়, সেই মাত্রার সংঘাতের মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা দেশটির সাধারণ মানুষের নেই।

উন্মাদনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলে সামরিক উন্মাদনার জোয়ার বয়ে গেছে। তিনি জানান, এবারের যুদ্ধ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের মতো নয়। তখন ইসরায়েলিদের মধ্যে ছিল অস্তিত্বের ভয়, আর এখন রয়েছে একরোখা সামরিক উন্মাদনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
এমনকি যুদ্ধের গুটিকয় সমালোচকও নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন, যেন ইসরায়েল চাইলেই যুদ্ধ শেষের তারিখ নির্ধারণ করতে পারবে।
জন্মের পর থেকে শেখানো শত্রু-ভাবনা
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল বার-তাল এই যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিমান হামলার মুখে ব্রিটিশদের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে হাই স্কুল ও সেনাবাহিনী পর্যন্ত ইসরায়েলিদের শেখানো হয়েছে, ইরান অশুভ শক্তি।
এই মানসিকতা ইসরায়েলি সমাজকে দিনের পর দিন আরও যুদ্ধমুখী করে তুলতে পারে। বার-তাল আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্ম আগের চেয়ে বেশি যুদ্ধবাজ ও ডানপন্থী এবং নেতানিয়াহু তাদের বোঝাচ্ছেন, টিকে থাকতে হলে তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে।
তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা, তবুও ঝুঁকি
ইসরায়েলের কাছে রয়েছে তিনটি আলাদা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। স্বল্পপাল্লার রকেট ঠেকাতে ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তার জানান, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনেই ইরান ২০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে একটি করে ইন্টারসেপ্টর রকেট খরচ হচ্ছে। আত্তারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা না থাকলে ইসরায়েল এতদিনে আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও লঞ্চার সংকট
আত্তার আরও জানান, ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রমতে ইরান প্রতি মাসে ১০০টি করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, অর্থাৎ তেহরান ইতিমধ্যে বিশাল মজুত গড়ে তুলেছে।
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ইরানের হুমকি কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার ওপর নয়, বরং ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যন্ত্র বা লঞ্চারের প্রাপ্যতার ওপরও নির্ভর করে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন ইরানের লঞ্চার অবকাঠামোকে নিশানা করে হামলা চালাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকটে ডুবছে ইসরায়েল
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা একের পর এক সামরিক অভিযান ইসরায়েলের অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজায় হামলায় সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে, আর ২০২৫ সালে তা বেড়ে পৌঁছেছে ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে।
এই অভূতপূর্ব ব্যয়ের কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিনটি প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। শির হেভার বলেন, ইসরায়েল এখন একই সঙ্গে ঋণসংকট, জ্বালানিসংকট, পরিবহনসংকট ও স্বাস্থ্যসেবা সংকটে জর্জরিত।
প্রযুক্তি থামাবে যুদ্ধ, অর্থনীতি নয়
শির হেভার সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের কোনোটিই একা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামাতে যথেষ্ট হবে না। কারণ এটি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, প্রযুক্তির প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে যা নিজেই লক্ষ্য স্থির করতে পারে এবং দূর থেকে হামলা চালাতে পারে, তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ ইসরায়েলের এই আগ্রাসন থামানোর জন্য যথেষ্ট হবে না বলেই মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
সূত্র: আল-জাজিরা


