মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কৌশলগত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশ্লেষক এড হারস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা-কে বলেন, যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানির অর্ধেক সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায় এবং মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এলএনজি ও গ্যাস বাজারে অস্থিরতা
হারস জানান, সংঘাতের প্রথম দিনেই বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম মাত্র এক দিনের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর প্রভাব ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানিতেও পড়ছে।
বিভিন্ন দেশ এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলিয়াম মজুত করতে শুরু করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে ভবিষ্যতের জ্বালানি সরবরাহ চুক্তিও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নিউ ইংল্যান্ডে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও। বিশেষ করে নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তা ঘরোয়া রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী ওমান ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়েই যায়।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য এটি প্রধান রপ্তানি রুট। পাশাপাশি কাতার থেকে সরবরাহকৃত অধিকাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।
এই প্রণালীর কার্যকর বিকল্প খুবই সীমিত এবং বিদ্যমান পাইপলাইনগুলোর ধারণক্ষমতাও কম। ফলে সামান্য বিঘ্নও বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছালে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্য, শিল্প ও ভোক্তা বাজারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন কেবল আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের তেলের বাজার।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


