ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের উত্তাপ এবার সরাসরি আছড়ে পড়েছে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ঘোষিত ইরান অভিযান সীমিত করতে মার্কিন সিনেটে আনা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। ৪৭-৫২ ভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অবস্থান আরও শক্ত হলো বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
কংগ্রেসের ক্ষমতা বনাম প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত
প্রস্তাবটির মূল উদ্দেশ্য ছিল— কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশের মাটিতে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করা। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, সরাসরি ও তাৎক্ষণিক হুমকি না থাকলে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে।
সিনেটে বিতর্কের সময় ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিম কেইন বলেন, প্রশাসন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসন্ন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার ভাষায়, “এটি সীমিত আঘাত নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতি।”
তবে রিপাবলিকানদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে প্রস্তাবটি পাসের সম্ভাবনা শুরু থেকেই ক্ষীণ ছিল।

রিপাবলিকানদের সমর্থনে শক্ত হলো ট্রাম্প
সামরিক অভিযানের পক্ষে দাঁড়িয়ে রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ দাবি করেন, দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরানের শত্রুতামূলক আচরণ প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়। তার মতে, ইরান আবারও পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সক্রিয় করার চেষ্টা করছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগে বলেছিলেন, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার জবাবে ইরান মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। তবে পরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানই আগে ইসরায়েলে হামলার পরিকল্পনা করছিল।
প্রতিনিধি পরিষদেও অনিশ্চয়তা
একই ধরনের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদেও তোলার কথা রয়েছে। তবে সেখানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সেটিও পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও এই প্রস্তাব সিনেটে পাস হলেও সেটি আইনে পরিণত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হতো। ট্রাম্প চাইলে ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে তা বাতিল করতে পারতেন। সেই ভেটো কাটাতে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন দরকার, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব।
যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ধোঁয়াশা
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, সামরিক অভিযান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় চলতে পারে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একাংশ বলছে, এটি দীর্ঘমেয়াদি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ নয়; বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ করেই শেষ হবে।
ভোটাভুটির রাজনৈতিক গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবটি পাস না হলেও এই ভোটাভুটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধের বৈধতা, সাংবিধানিক সীমা এবং নির্বাহী ক্ষমতার প্রশ্ন এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতির বড় ইস্যু হয়ে উঠছে।
অ্যাডভোকেসি সংগঠনগুলোর মতে, নির্বাচনের বছরে ভোটাররা মনে রাখবেন— কে যুদ্ধের পক্ষে এবং কে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এই ভোট ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন সিনেটে প্রস্তাব বাতিলের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো— ইরান যুদ্ধ প্রশ্নে কংগ্রেসে বিভাজন থাকলেও রিপাবলিকানদের সমর্থনে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল আপাতত বাধাহীনই থাকছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


