আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখনই ‘শান্তি চুক্তি’ বা ‘যুদ্ধবিরতি’ নিয়ে কূটনৈতিক টেবিলে বড় বড় ভাষণ আর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, বাস্তবে গাজার মাটিতে তখনো জ্বলতে থাকে আগুনের লেলিহান শিখা, ঝরতে থাকে সাধারণ মানুষের রক্ত।
যুদ্ধের দাবানল কমেনি, শান্তি চুক্তির খাতা কাগজে-কলমে বন্দী থাকলেও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও নির্বিচার হামলা যেন থামার নাম নেই। এই বৈপরীত্য বিশ্ববিবেক ও আন্তর্জাতিক আইনের মুখে এক বিরাট চপেটাঘাত।
কাগজের চুক্তি বনাম গাজার রক্তস্নাত বাস্তবতা
অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ‘যুদ্ধবিরতি’ কিংবা ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ শব্দগুলো আজ শুধুই মিথ্যা সান্ত্বনা। যে চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা ও দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, বাস্তবে সেখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে উল্টো চিত্র।

প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে নতুন নতুন মৃতদেহ যোগ হচ্ছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রক্তাক্ত শিশুদের চিৎকার বাতাসে ভাসছে। আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার মাঝেও যেভাবে গাজা সিটি, হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট—মানবাধিকার ও শান্তিচুক্তিকে কেবল একতরফাভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে তারা।
কেন থামছে না রক্তপাত?
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর দ্বিচারিতা এবং কার্যকরী কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় এই নির্মমতা থামছে না।
১. জবাবদিহিতার অভাব: আন্তর্জাতিক আদালত বা জাতিসংঘে অসংখ্য প্রস্তাব গৃহীত হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে এর কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। কোনো রকম কঠোর জবাবদিহিতা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না থাকায় চুক্তি ভঙ্গ করাটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।
২. ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা: তথাকথিত নিরাপত্তা বা সুনির্দিষ্ট অভিযানের নাম দিয়ে পুরো বেসামরিক গাজাবাসীকে সম্মিলিত শাস্তির (Collective Punishment) মুখোমুখি করা হচ্ছে।
৩. মানবিক সাহায্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার: ধ্বংসস্তূপ সরালে প্রতিদিন নতুন নিখোঁজ মানুষের সন্ধান মিলছে। একই সাথে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে এক অমানবিক অচলাবস্থা তৈরি রাখা হয়েছে।
মাজলুমের আত্মচিৎকার ও বিশ্বের নৈতিক দায়বদ্ধতা
ফিলিস্তিনিরা আজ চরম মাজলুম ও গৃহহীন। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ জীবন, নিজ ভূমিতে পরবাসী হওয়া এবং একের পর এক গণহারে স্বজন হারানোর এই ক্ষত কোনো চুক্তি দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।
গাজার বোমার আওয়াজ কেবল তাদের বসতবাড়িই ধ্বংস করছে না, বরং তা ধ্বংস করছে বিশ্ব মানবতার নৈতিক ভিত্তিকেও।
বিশ্বনেতাদের বুঝতে হবে—গাজায় শুধু কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর হামলা চলছে না, সেখানে পদদলিত হচ্ছে গোটা মানবতা।
ঠুনকো অজুহাতে প্রতিদিন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক হত্যা বন্ধ না হলে যেকোনো শান্তি আলোচনা কেবল প্রহসন হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।
গাজার মাজলুম মানুষের জন্য আজ প্রয়োজন কোনো ফাঁকা বুলি নয়, বরং অবিলম্বে আন্তর্জাতিকভাবে বাস্তবায়িত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ন্যায়বিচারের শক্ত পদক্ষেপ।


