গাজায় ধর্ষণের শিকার নারীদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্ষকের সঙ্গেই, বাল্যবিবাহ বেড়েছে ১২৩%: জাতিসংঘ

গাজায় চলমান মানবিক সংকটের মধ্যে নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সংস্থাটির জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) প্রকাশিত দুটি পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে গাজায় বাল্য ও জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা আগের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই সময়ে গাজায় সংঘটিত মোট লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ৬৮ শতাংশের শিকার হয়েছেন ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হার মানসিক ও আবেগজনিত নির্যাতনের, এরপর রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক ও বাল্যবিবাহ।

গবেষকরা এর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত ও অপ্রতুল আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস এবং খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী ও পোশাকের মতো মৌলিক চাহিদার তীব্র সংকটকে চিহ্নিত করেছেন।

গাজা সিটি ও খান ইউনিসের শরণার্থী শিবিরে ২৩০ জন নারীর সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি দ্বিতীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র।

একটি স্কুলকেন্দ্রিক আশ্রয়শিবিরে থাকা এক নারী জানান, ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পেলে লজ্জা ও কলঙ্ক এড়াতে ভুক্তভোগীকে প্রায়ই তার ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, স্কুলে ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে পরের দিনই সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠান ও উদ্‌যাপন দেখা যায়।

আরেক নারী জানান, এক ব্যক্তি তার ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে মাত্র দুই বস্তা আটার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন, যাতে তিনি ও তার অন্য সন্তানরা খেতে পারেন।

অনেক পরিবার আবার শরণার্থী শিবিরে ঘোরাফেরা করা সম্ভাব্য ধর্ষকদের হাত থেকে মেয়েদের রক্ষার আশায় অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এর আগেও ইউএনএফপিএ জানিয়েছিল, যুদ্ধে অভিভাবকহারা কিশোরীরা যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে।

গাজা সিটির একটি শিবিরে বসবাসকারী এক নারী বলেন, তিনি নিজে ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী দুই কিশোরীর বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন, যাদের অভিভাবকরা কার্যত তাদের দায়িত্ব এড়াতে বিয়ে দিয়ে দেন।

তিনি জানান, বাবা-মা যুদ্ধে মারা যাওয়ার পর তাদের চাচারা দায়িত্ব ও খরচের বোঝা এড়াতে অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়েছেন।

ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, গাজায় বর্তমানে প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবারের প্রধান নারী, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। ফলে বিধবা ও একক মায়েরা যৌন নিপীড়ন ও শোষণের বাড়তি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

একটি সাক্ষ্যে বলা হয়, তাঁবু খুঁজতে থাকা এক বিধবাকে শিবিরের এক প্রতিনিধি তাঁবু দেওয়ার প্রস্তাবের বিনিময়ে রাতে তার সঙ্গে থাকার শর্ত দেন।

গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এখনো অব্যাহত থাকায় মানবিক সংকট চলমান রয়েছে। প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনি এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন, আর গাজা ভূখণ্ডের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনগুলো এমন সময় প্রকাশ পেল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বুধবার গাজার জন্য একটি বহু-পর্যায়ের পুনর্গঠন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

ম্যানহাটনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ঘোষিত এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ছয় মাসে ব্যয় হবে ২৪৫ কোটি ডলার। অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনকেন্দ্রিক মোট ৬৬টি কর্মসূচির মাধ্যমে পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আনুমানিক ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক পোস্ট

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top