বিশ্বকাপ থেকে অকাল বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল ব্রাজিল। প্রথমার্ধে জাপানের কাছে পিছিয়ে পড়া দলটি দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় পুরোপুরি। কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত সিদ্ধান্ত, খেলোয়াড়দের ধৈর্য এবং শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে সেলেসাওদের শেষ ষোলো।
ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটি ছিল শুধু জয়ের নয়, আত্মবিশ্বাস টিকিয়ে রাখারও লড়াই। প্রথমার্ধ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় খেলোয়াড়দের চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট ছিল। ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বিশ্বকাপ বিদায়ের আশঙ্কা তখন বাস্তব হয়ে উঠেছিল।
জাপান শুরু থেকেই সংগঠিত ফুটবল খেলেছে এবং এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পিছিয়ে পড়ে আর কখনও ঘুরে দাঁড়িয়ে জেতেনি ব্রাজিল। সেই পরিসংখ্যানও সেলেসাওদের বিপক্ষেই কথা বলছিল।

দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র
বিরতির সময় বড় কোনো কৌশলগত ওলটপালট করেননি কোচ কার্লো আনচেলত্তি। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার পরিবর্তে এন্দ্রিককে নামানো ছিল একমাত্র বাধ্যতামূলক পরিবর্তন। তবে ড্রেসিংরুমে তিনি খেলোয়াড়দের প্রতি আস্থা হারাননি।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, দলের ওপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। তার মতে, প্রথমার্ধে কিছু সমস্যায় পড়লেও ব্রাজিল কখনও নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারায়নি এবং খেলোয়াড়রা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সামর্থ্য রাখত।
দ্বিতীয়ার্ধে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলনও দেখা যায় মাঠে। ছোট পাসের বদলে জাপানের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে উইং ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে বক্সে বল পাঠাতে শুরু করে ব্রাজিল। প্রথমার্ধে যেখানে ১২টি ক্রস করেছিল, দ্বিতীয়ার্ধে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮-এ।
এই পরিবর্তনের ফল দ্রুতই মেলে। ব্যাক পোস্টে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা জায়গা বের করতে শুরু করলে জাপানের রক্ষণ চাপে পড়ে। সেই ধারাবাহিক আক্রমণ থেকেই আসে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোল।
আনচেলত্তির কৌশলেই খুলে যায় পথ
ম্যাচ বিশ্লেষণে বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ারনক বলেন, বিরতির পর আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাপান বক্সে আসা ধারাবাহিক বল সামাল দিতে পারেনি।
আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবলের জন্য পরিচিত ব্রাজিল এদিন প্রয়োজনে বাস্তববাদী পথ বেছে নেয়। আনচেলত্তির মতে, সব ম্যাচ একইভাবে জেতা যায় না; কখনও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে কৌশল বদলাতেই হয়।
শেষ মুহূর্তের গোলে বেঁচে রইল শিরোপার স্বপ্ন
শেষ দিকে জাপানের একটি ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্রুনো গিমারায়েস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির ঠান্ডা মাথার খেলায় তৈরি হয় জয়সূচক আক্রমণ। যোগ করা সময়ের ৯৫তম মিনিটে পাওয়া সেই গোল ব্রাজিলকে শুধু জয়ই দেয়নি, ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও বাঁচিয়ে রেখেছে।
ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, ফুটবলে ভুল হবেই, কারণ কেউই নিখুঁত নয়। তবে সেই ভুল কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই বড় বিষয়, আর তার দল সেটাই করেছে।
এই জয়ের পর ব্রাজিল এখন শেষ ষোলোতে আইভরি কোস্ট বা নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামার অপেক্ষায়। কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিজ্ঞতা দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ম্যাচ শেষের পর সবচেয়ে বড় অনুভূতি ছিল স্বস্তি, আর সেই স্বস্তির নেপথ্যে ছিলেন ঠান্ডা মাথার কার্লো আনচেলত্তি।


