হামলা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পঞ্চম দিনে পৌঁছে নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরান ও লেবাননে হামলা জোরদার করেছে, আর পাল্টা হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে জবাব দিচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও আল-জাজিরা-এর খবরে জানা গেছে, ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে এবং যুদ্ধ ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

কাতার থেকে দুবাই: মার্কিন স্থাপনায় ইরানের হামলা

ইরানের পাল্টা আঘাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। কাতারের আল-উদেইদে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। একই রাতে দুবাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের পর ভবনের পাশে আগুন ধরে যায়, যদিও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অস্থায়ী মার্কিন অপারেশন সেন্টারে হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ইরাকের রাজধানী বাগদাদেও মার্কিন দূতাবাসে সতর্কসংকেত বাজতে শোনা গেছে।

হামলা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল, পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান

যুদ্ধ ১২টির বেশি দেশে, বাড়ছে অস্থিরতা

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ১২টিরও বেশি দেশে প্রভাব ফেলেছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগার, কুয়েত সিটি, ইরাক ও তুরস্কের আকাশসীমায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-সম্পৃক্ততা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন কংগ্রেসে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অভিযোগ করেছেন, এই যুদ্ধের সুস্পষ্ট কৌশল বা বৈধতা নেই।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’: ইরানের আকাশসীমা দখলের ঘোষণা

যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। অভিযানে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, দুটি বিমানবাহী রণতরি ও একাধিক বোমারু বিমান অংশ নিচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় দুই হাজার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, খুব দ্রুতই ইরানের আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অস্ত্র সরবরাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।

তেহরানে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, নিহতের সংখ্যা বাড়ছে

রাজধানী তেহরানসহ ইরানের দেড় শতাধিক শহরে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতভর অন্তত ৩০টির বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, হামলায় নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা HRANA জানিয়েছে, নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক, যার মধ্যে শিশু রয়েছে। আহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে।

লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযান

ইসরায়েল লেবাননের ভেতরে স্থল অভিযানও শুরু করেছে। সীমান্ত পেরিয়ে সেনারা খিয়াম শহর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। রাজধানী বৈরুত ও বালবেকসহ বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলায় বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। হিজবুল্লাহ পাল্টা হিসেবে উত্তর ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে।

লেবাননের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েক দশ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থল অভিযানের আশঙ্কা, বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্থল অভিযান কি অনিবার্য হয়ে উঠছে? বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ভৌগোলিকভাবে ইরাকের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বড়, ফলে সরাসরি স্থল অভিযান সহজ হবে না। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর বাড়তে পারে।

অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া ও চীনসহ একাধিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছে। তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কার লাভ?

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কৌশলগতভাবে ইরান সুবিধা পেতে পারে। কারণ ইরানের ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। হামলা–পাল্টা হামলার এই চক্রে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নতুন এক বৃহৎ সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীরভাবে পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top