দেশের সাম্প্রতিক গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে আকস্মিক কোনো কারিগরি বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন না লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য। তাঁর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চুক্তি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল, সরবরাহ ঘাটতি ও ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
পিনাকীর অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট হবিগঞ্জ শিল্প পার্কে গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এর পরদিন জেলার ১৭১টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এতে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ শ্রমিক ও দিনমজুর কর্মহীন হয়ে পড়েন।
একই সময়ে নরসিংদী, মাধবদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কথাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পিনাকীর দাবি, এসব এলাকার বস্ত্র, ডাইং, প্রিন্টিং ও রি-রোলিং মিলের প্রায় ৮০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ বা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। বিএসআরএমের ১০টি প্রধান কারখানা বন্ধ রাখার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতেও সংকটের প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে পিনাকী জানান, দেশের ৩০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং রপ্তানি ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর দাবি, ইউরোপের কয়েকটি বড় ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে প্রতিবেশী দেশে নিয়ে যাচ্ছে। সংকট সামাল দিতে ব্যবসায়ীরা বিলম্বিত গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগও চেয়েছেন।
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি, প্রায় ৩৭ শতাংশ, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে সামিট এবং অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের জাহাজে আগুন লাগার ঘটনাকে শুরুতে কারিগরি ত্রুটি হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তদন্তের তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পিনাকী।
তাঁর অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্ট মেরামত শেষ হলেও ১৭ আগস্টের নির্ধারিত এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় ১৯ থেকে ২২ আগস্ট দেশের সমুদ্র টার্মিনালগুলোতে গ্যাসের মজুদ শূন্য হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগও করেছেন পিনাকী। তাঁর দাবি, টেন্ডার ছাড়া বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আনার চেষ্টা করা কয়েকটি কার্গোর ক্ষেত্রে সরবরাহকারী নির্বাচনে গাফিলতি ছিল। ‘আল-হামলা’ নামের একটি এলএনজি কার্গোর নকশা ও মহেশখালী টার্মিনালে নোঙর করার সক্ষমতা নিয়ে সমস্যার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার দাম নিয়েও অনুসন্ধানে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে প্রতি ইউনিট গ্যাস ২২ দশমিক ৩৫ ডলারে কেনা হয়েছে, যেখানে আগের চুক্তি বা স্বাভাবিক কেনাকাটায় দাম ছিল ৯ থেকে ১০ দশমিক ৪০ ডলার। তিন দিনের সরবরাহের জন্য একটি কার্গো কিনতেই প্রায় ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল নিয়ে পিনাকীর অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই স্বাক্ষরিত ১৫ বছর মেয়াদি বিওটি চুক্তির প্রসঙ্গও এসেছে। তাঁর দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও সজীব ওয়াজেদ জয় ওই চুক্তি সম্পাদনে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। চুক্তির আওতায় পুরোনো একটি জাহাজ ব্যবহার এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
পিনাকীর হিসাবে, ওই টার্মিনালের জন্য দৈনিক ৪ লাখ ৫৪ হাজার ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়, যা বছরে প্রায় ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। জাহাজে সমস্যা থাকলেও এই অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
এ ছাড়া ২০১০ সালের একটি বিশেষ আইনের কারণে জ্বালানি খাতের এসব চুক্তির তথ্য জনগণের সামনে পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন শিল্পের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতেও পড়তে পারে। কারখানা বন্ধ থাকায় আয় কমে গেলে খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
কাতারের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বিষয়টিও অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। পিনাকীর দাবি, ২০২৬ সালের মার্চে কাতার বাংলাদেশকে জানায়, চুক্তিতে নির্ধারিত ৪০টি কার্গোর পরিবর্তে তারা ২০টি সরবরাহ করতে পারবে। তাঁর অভিযোগ, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে এ ঘাটতি মোকাবিলায় তৎকালীন সরকার কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা নেয়নি।
বর্তমান সংকট নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের পরস্পরের ওপর দায় চাপানোরও সমালোচনা করেছেন পিনাকী ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার সমাধান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার বক্তব্য না দিয়ে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সবশেষে মহেশখালীর দুটি এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি, ঋণ ও ক্যাপাসিটি চার্জের শর্তসহ শেখ হাসিনা সরকারের সময় সজীব ওয়াজেদ জয় ও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন পিনাকী। রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী বলে তিনি যেসব চুক্তিকে অভিহিত করেছেন, সেগুলো পুনর্বিবেচনা বা সংশোধনের আহ্বানও জানিয়েছেন।


