তীব্র গরমের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোনো কোনো এলাকায় টানা ১০ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকটের পেছনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করছে—গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি, ভারত থেকে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়া এবং সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যা।
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কম হচ্ছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট।

কয়লার সংকটও উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। পিডিবির হিসাবে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা সংকট ও অন্যান্য সমস্যায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আরও অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। এই প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতিই বর্তমান লোডশেডিংয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়া। স্বাভাবিক পিক আওয়ারে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা থাকলেও গত রোববার বিকাল ৫টায় সরবরাহ নেমে আসে ৮১৫ মেগাওয়াটে। পিডিবিকে আদানি জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হওয়ায় তাদের মজুত কমেছে এবং উৎপাদনও কমাতে হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যার সত্যতা পিডিবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাবে, রোববার বিকাল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকাল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও তখনও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্যাস ও কয়লার সংকটের কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোও দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে ধাপে ধাপে সেগুলো থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমস্যাও ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন সমস্যা এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে গ্রাহক পর্যায়ে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। কোনো একটি বিভাগে একটি মাত্র বিতরণ কোম্পানি থাকলে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।
গ্যাস সংকটের পেছনেও সাম্প্রতিক একটি ঘটনা প্রভাব ফেলেছে। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এতে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই সংকট তৈরি হয়। মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে টার্মিনালটি থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সোমবার রাত বা মঙ্গলবার থেকে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ শুরু হতে পারে।


