গ্যাস-জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, সংকট কাটাতে নানা উদ্যোগ

গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং কয়েকটি উৎস থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাসের স্বল্পতা। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমপক্ষে ২ হাজার মেগাওয়াট কমেছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে উৎপাদন হচ্ছে ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট, যদিও সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট।

গ্যাস-জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, সংকট কাটাতে নানা উদ্যোগ

কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। কয়লার ঘাটতি ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ার এবং আরএনপিএলের উৎপাদন কমেছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা কেন্দ্রে এক পর্যায়ে উৎপাদন নেমে আসে ৭১০ মেগাওয়াটে। এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট উৎপাদন হলেও কেন্দ্রটির সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

এর সঙ্গে ভারতের আদানি গ্রুপ থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। সাধারণ পিক আওয়ারে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হলেও রোববার বিকেল ৫টায় পাওয়া গেছে ৮১৫ মেগাওয়াট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা ও মজুদ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমানো হয়েছে বলে আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে তাদের দেওয়া তথ্য কতটা সঠিক, তা পিডিবি যাচাই করতে পারেনি।

গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে আংশিক সরবরাহ শুরু হয়। রোববার সন্ধ্যায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যেখানে আগে সরবরাহ ছিল ১১০ কোটি ঘনফুট। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে সরবরাহ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে অপচয় রোধ, অনিয়ম দমন, বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অতীতে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা দেওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে বর্তমানে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও ধীরে ধীরে চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের পেছনে নীতিগত দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলমের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে বৈষম্য রয়েছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতির কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিস্থিতিও এক নয়। মাতারবাড়ীর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। অন্যদিকে টেকনাফের আলীখালী সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।

বাগেরহাটের রামপাল কেন্দ্রও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কেন্দ্রটি গত অর্থবছরে ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যেখানে আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট। তবে গত এক বছরে যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লার ঘাটতির কারণে কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট ৩০ বার বন্ধ হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে নিয়মিত ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কথা জানানো হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে চলে যাওয়ায় এবং কেন্দ্রটির পাশে গ্রিড সাবস্টেশন না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা এর সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রেও উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম। তিনটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে দুটি দিয়ে উৎপাদন চলছে এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২২০ মেগাওয়াট। যান্ত্রিক ত্রুটি ও মেরামতের কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না।

পটুয়াখালীর পায়রা, আরএনপিএল ও পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্ট মিলিয়ে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৭৯০ মেগাওয়াট। তবে পায়রা বন্দরের নাব্য সংকটের কারণে মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় কুতুবদিয়া থেকে লাইটার জাহাজে কয়লা পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে সময় ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বর্তমানে পায়রা কেন্দ্রে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন কয়লা মজুদ রয়েছে।

সব মিলিয়ে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা এবং আমদানি ও পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করাই এখন বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top