বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ভারতে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। তাঁর মতে, নিজ দেশে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে অস্থিতিশীলতা তৈরির নির্দেশ দিলে আশ্রয়দাতা দেশ সেই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর দৈনিক ইনকিলাবকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক রাজনীতি, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানো, দল পরিচালনার অগ্রাধিকার এবং সরকারের জবাবদিহিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন রিজভী।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রিজভী বলেন, বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে একাধিকবার তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনা সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় বিচার ও সাজা হয়েছে। তাই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা উচিত।

ভারত থেকে শেখ হাসিনার বিভিন্ন অডিওবার্তায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, একটি দায়িত্বশীল দেশ এভাবে দায় এড়াতে পারে না। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়ার পর যদি সেই দেশ থেকেই নিজের দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নির্দেশ দেন, তাহলে বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে।
রিজভী দাবি করেন, বিশ্বের অনেক দেশেই আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ থাকে। তাঁর মতে, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়ায় দুই দেশের পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে রিজভী বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সেটিই তাঁর জন্য সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। তবে একই সঙ্গে এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করছে। প্রায় এক দশক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলের নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে বলে জানান তিনি।
দলের নতুন দায়িত্বে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম জনগণের কাছে তুলে ধরাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন রিজভী। তিনি বলেন, জনগণের নির্বাচিত দল হিসেবে সরকার যেসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, সেগুলো তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দলের অন্যতম দায়িত্ব। কর্মসংস্থান, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জনগণকে জানানো প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারে থাকা মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পর্ক এবং জবাবদিহি নিয়েও কথা বলেন রিজভী। তাঁর মতে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিজেদের এলাকায় জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে এবং দলীয় নেতাকর্মীদেরও জনগণের পাশে থাকতে হবে। একই সঙ্গে নেতাকর্মীরা যাতে অনৈতিক বা অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রীদের একদিকে দলের কাছে এবং অন্যদিকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, গত ৯ মে কয়েকজন মন্ত্রীকে দলের তৃণমূল নেতাদের সামনে নিজেদের কাজের বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। পাশাপাশি সংসদে বিরোধী দল, গণমাধ্যম ও জনগণের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মধ্য দিয়েও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিএনপির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে রিজভী বলেন, দলটির গঠনতন্ত্রের ঘোষণাপত্র, ১৯ দফা, ভিশন ২০৩০ এবং পরবর্তী সময়ে ৩১ দফা কর্মসূচিতে বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ধর্ম, সংস্কৃতি, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব নীতির প্রতিফলন রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভীর মতে, সময়ের সঙ্গে বিএনপির নীতিগুলোকে আরও আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচির মধ্যেও সেই চিন্তার প্রতিফলন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জিয়াউর রহমানের সময়কার গণশিক্ষা, গণসাক্ষরতা, নৈশ বিদ্যালয় ও গ্রামাঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।


