বাংলাদেশ থেকে জাপান, ৫০ বছর পর বেজিমুক্ত আমামি ওশিমা

জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে বিষাক্ত হাবু সাপের সংখ্যা কমাতে ১৯৭৯ সালে আনা হয়েছিল মাত্র ৩০টি ছোট ভারতীয় বেজি। পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়। সাপের বদলে দ্বীপের বিরল প্রাণীদের শিকার করে বেজির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজারে। প্রায় পাঁচ দশকের অভিযান শেষে ২০২৪ সালে দ্বীপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেজিমুক্ত ঘোষণা করে জাপান সরকার।

এই ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশেরও সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য ও ডিএনএ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমামি ওশিমায় নেওয়া বেজিগুলোর পূর্বসূরিদের ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকেই অন্তত ৩০টি বেজি আমামি ওশিমায় পৌঁছায়।

১৯৭৯ সালে কাগোশিমা প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত সবুজে ঘেরা দ্বীপটিতে হাবু সাপের উপদ্রব কমানোর উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ধারণা ছিল, সাপের স্বাভাবিক শিকারি বেজি বিষাক্ত সাপের সংখ্যা কমিয়ে দেবে। কিন্তু পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, হাবু সাপ ও বেজির সক্রিয় থাকার সময় এক নয়।

বাংলাদেশ থেকে জাপান, ৫০ বছর পর বেজিমুক্ত আমামি ওশিমা

হাবু সাপ মূলত রাতে শিকার করে। অন্যদিকে বেজি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। ফলে সাপ ও বেজির মধ্যে প্রত্যাশিত শিকার-সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সাপ শিকার করতে না পেরে বেজিগুলো দ্বীপের অন্যান্য প্রাণীর ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।

আমামি ওশিমায় বেজিদের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক শত্রুও ছিল না। এতে দ্রুত তাদের বংশবিস্তার ঘটে। বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও উভচরসহ বিভিন্ন স্থানীয় প্রাণী তাদের শিকারে পরিণত হয়। বিশেষ করে আমামি খরগোশ বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ে। বেজির কারণে দ্বীপের সাতটি স্থানীয় প্রজাতি বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে যায়।

১৯৯৩ সাল থেকে স্থানীয় পর্যায়ে বেজি নির্মূলের কাজ শুরু হয়। পরে ২০০০ সাল থেকে জাপান সরকার পুরো দ্বীপজুড়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিযান চালায়। প্রায় ৭১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এলাকায় বসানো হয় প্রায় ৩০ হাজার ফাঁদ ও সেন্সর ক্যামেরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘আমামি মঙ্গুস বাস্টার্স’ নামে বিশেষ দল।

২০১৮ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ একটি বেজি ধরা পড়ে। এরপরও ছয় বছর ধরে দ্বীপজুড়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। কোথাও বেজির অস্তিত্ব না পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমামি ওশিমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেজিমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ থেকে ওকিনাওয়া এবং পরে আমামি ওশিমায় বেজির এই দীর্ঘ যাত্রার তথ্য ঐতিহাসিক নথি ও ডিএনএ বিশ্লেষণেও সমর্থন পেয়েছে। অর্থাৎ মানুষের হাত ধরে এক শতাব্দীর বেশি সময় আগে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া একটি প্রাণী শেষ পর্যন্ত জাপানের একটি দ্বীপে বড় পরিবেশগত সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তবে এই ঘটনায় বেজিগুলোকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। তারা নিজের ইচ্ছায় আমামি ওশিমায় যায়নি। নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সহজলভ্য প্রাণী শিকার করাই ছিল তাদের স্বাভাবিক আচরণ। সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল মানুষের নেওয়া একটি পরিবেশগত সিদ্ধান্ত থেকে।

আমামি ওশিমার ঘটনা দেখিয়েছে, কোনো বাস্তুতন্ত্রে একটি প্রাণীকে সরিয়ে দেওয়া বা অন্য পরিবেশ থেকে নতুন কোনো প্রাণী এনে ছেড়ে দেওয়ার আগে খাদ্যশৃঙ্খল, প্রাকৃতিক শত্রু, সক্রিয় থাকার সময়, খাদ্যাভ্যাস ও বংশবিস্তারের সম্ভাবনাসহ নানা বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।

হাবু সাপ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে যে বেজিগুলো আনা হয়েছিল, প্রায় ৫০ বছর পর সেই বেজি নির্মূল করতেই জাপানকে দীর্ঘ সময়, বিপুল শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছে। তবে এত দীর্ঘ অভিযানেও হাবু সাপ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি; বিষাক্ত এই সাপ এখনো আমামি ওশিমার জঙ্গলে রয়েছে।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top