ইলহান ওমর ও এল-সায়েদের জয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম প্রার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দুই প্রার্থীর সাম্প্রতিক জয়ে। মিনেসোটায় প্রতিনিধি ইলহান ওমর বড় ব্যবধানে প্রাইমারি জয় পেয়েছেন। অন্যদিকে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়ে সিনেট নির্বাচনের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক ড. আব্দুল এল-সায়েদ।

মিনেসোটার ৫ম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রাইমারিতে ইলহান ওমর ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। বিপুল এই ব্যবধানে জয় তার প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সমর্থন আরও স্পষ্ট করেছে।

সোমালি বংশোদ্ভূত ও সাবেক শরণার্থী ইলহান ওমর ২০১৯ সালে প্রথমবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন। তিনি কংগ্রেসের প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের একজন এবং প্রথম সোমালি-আমেরিকান প্রতিনিধি। অভিবাসন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং ইসরায়েল বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল অবস্থানের কারণে তিনি মার্কিন রাজনীতিতে আলোচিত একটি কণ্ঠস্বর।

অন্যদিকে, গত ৪ আগস্ট মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে সিনেট নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন ড. আব্দুল এল-সায়েদ। নভেম্বরের চূড়ান্ত নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হবেন।

এল-সায়েদের প্রাইমারি জয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিপুল নির্বাচনী ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তাকে ঠেকাতে ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ আইপ্যাক ও সহযোগী সংগঠনগুলো প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয় করে। হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে বাইরে থেকে ব্যয় হয় প্রায় ৫ কোটি ডলার। নির্বাচনের শেষ পাঁচ সপ্তাহে শুধু টেলিভিশন বিজ্ঞাপনেই স্টিভেন্সের পক্ষে ব্যয় করা হয় ২ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যেখানে এল-সায়েদের পক্ষে ব্যয় ছিল ২১ লাখ ডলার।

তবে এই বিপুল অর্থ ও প্রচারণার মধ্যেও মিশিগানের ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সমর্থন পান এল-সায়েদ। তার জয় যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ সদস্যের সিনেটে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে ইলহান ওমর, রাশিদা তালাইব ও আন্দ্রে কার্সনের মতো মুসলিম আইনপ্রণেতা থাকলেও সিনেটে এখন পর্যন্ত কোনো মুসলিম সদস্য নেই।

এল-সায়েদের জয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ঘিরে প্রকাশ্যে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ‘জিহাদি’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে একাধিক পোস্টও দেন। এর আগে তিনি এল-সায়েদকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।

রিপাবলিকান দলের আরও কয়েকজন নেতাও এল-সায়েদকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। সাউথ ক্যারোলিনার প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস মুসলিম সরকারি কর্মকর্তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। আলাবামার সিনেটর টমি টুবারভিল এল-সায়েদকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘র‍্যাডিকাল ইসলামপন্থী’ বলে আখ্যা দেন।

৯/১১-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনীতিকদের আনুগত্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বারবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান এবং ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করা মুসলিম প্রার্থীদের জন্য বাড়তি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইলহান ওমর ও এল-সায়েদের সাম্প্রতিক জয়কে মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইলহান ওমরের বড় ব্যবধানে জয় ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশকে নতুন শক্তি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন মুসলিম নেতাদের একটি সাম্প্রতিক গোলটেবিল আলোচনায় প্রতিনিধি রাশিদা তালাইব বলেন, ২০১৯ সালে তিনি ও ইলহান ওমর কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২০০ মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। তার মতে, এই অগ্রগতি মুসলিমদের নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে তুলে ধরার সাহস জুগিয়েছে।

ইলহান ওমরও বলেন, আগে মুসলিম প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় কিছুটা আড়ালে রাখার পরামর্শ দেওয়া হতো। এখন সেই পরিস্থিতি বদলেছে এবং তরুণ মুসলিম প্রার্থীরা নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেই নির্বাচনে জয়ী হতে পারছেন।

ড. আব্দুল এল-সায়েদের ভাষায়, মুসলিম প্রার্থীরা নতুন পথ তৈরি করলে তা শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের অন্য প্রার্থীদের জন্যও রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করে। আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে তার জয় হলে সেই প্রতিনিধিত্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top