শরীর সব সময় ক্লান্ত লাগে, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয় বা হাত-পায়ে ঝিনঝিনি অনুভব করেন? এমন লক্ষণ অনেক সময় ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার নিয়মিত খেলে এই ঘাটতি অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এই ভিটামিন রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতা এবং শরীরে শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেহেতু মানবদেহ নিজে থেকে ভিটামিন বি ১২ তৈরি করতে পারে না, তাই প্রতিদিনের খাদ্য থেকেই এর চাহিদা পূরণ করতে হয়।
এই নিবন্ধে ভিটামিন বি ১২ কী, কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ, ঘাটতির লক্ষণ কী এবং কোন কোন খাবার থেকে সহজেই ভিটামিন বি ১২ পাওয়া যায় তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ভিটামিন বি ১২ কী এবং কেন এটি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভিটামিন বি ১২, যা কোবালামিন নামেও পরিচিত, একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। এটি শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুর সুরক্ষা এবং ডিএনএ তৈরিতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ভিটামিন বি ১২ থাকলে শরীরে শক্তি বজায় থাকে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ভালো থাকে এবং রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের সমস্যাই দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন বি ১২-এর প্রধান উপকারিতা
ভিটামিন বি ১২ শুধু একটি সাধারণ ভিটামিন নয়। এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও সিস্টেমকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে
রক্তের লোহিত কণিকা তৈরির জন্য ভিটামিন বি ১২ অপরিহার্য। পর্যাপ্ত বি ১২ না থাকলে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে, যার ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে
স্নায়ুর চারপাশে থাকা সুরক্ষামূলক আবরণ বা মাইলিন ঠিক রাখতে ভিটামিন বি ১২ গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্নায়ুর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান স্বাভাবিক রাখে এবং হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অসাড়তা কমাতে সাহায্য করে।
শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে
ভিটামিন বি ১২ সরাসরি শক্তি তৈরি না করলেও খাবার থেকে প্রাপ্ত পুষ্টিকে শক্তিতে রূপান্তর করতে শরীরকে সহায়তা করে। তাই এর ঘাটতি হলে অনেক সময় সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভূত হয়।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় রাখে
স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং মানসিক সুস্থতার সঙ্গে ভিটামিন বি ১২-এর সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত বি ১২ থাকলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে এবং বয়সজনিত কিছু সমস্যা কমানোর ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে।
ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির লক্ষণ
ভিটামিন বি ১২-এর অভাব অনেক সময় ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। শুরুতে সাধারণ ক্লান্তি মনে হলেও পরে এটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করা উচিত।
- সারাক্ষণ দুর্বল বা ক্লান্ত অনুভব করা
- ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
- মাথা ঘোরা
- হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি অনুভূতি
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
- মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
- জিহ্বা ব্যথা বা ফুলে যাওয়া
- মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া
- হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো
এই লক্ষণগুলোর এক বা একাধিক থাকলেই যে ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতি রয়েছে, এমন নয়। নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার কেন প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত?
যেহেতু শরীর নিজে থেকে ভিটামিন বি ১২ তৈরি করতে পারে না, তাই খাদ্যই এর প্রধান উৎস। নিয়মিত ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাবার খেলে ঘাটতির ঝুঁকি কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীর সুস্থ থাকে।
বিশেষ করে যারা বয়স্ক, গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী মা, নিরামিষভোজী বা দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ভিটামিন বি ১২ গ্রহণ আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন বি ১২ কোথা থেকে পাওয়া যায়?
ভিটামিন বি ১২ মূলত প্রাণিজ উৎসের খাবারে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার এর অন্যতম ভালো উৎস। এছাড়া বর্তমানে কিছু ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল, সয়া দুধ এবং উদ্ভিদভিত্তিক পানীয়তেও অতিরিক্ত ভিটামিন বি ১২ যোগ করা হয়।
আপনার খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী সঠিক খাবার নির্বাচন করলে প্রতিদিনের বি ১২-এর চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার: সবচেয়ে ভালো খাদ্য উৎস
ভিটামিন বি ১২-এর সবচেয়ে ভালো উৎস হলো প্রাণিজ খাবার। এসব খাবারে প্রাকৃতিকভাবে উচ্চমাত্রায় বি ১২ থাকে এবং শরীর সহজেই তা শোষণ করতে পারে। এছাড়া বর্তমানে কিছু ফোর্টিফায়েড খাবারও বাজারে পাওয়া যায়, যা নিরামিষভোজীদের জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে।
নিচে সবচেয়ে কার্যকর ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মাছ: ভিটামিন বি ১২-এর অন্যতম সেরা উৎস
মাছ শুধু প্রোটিন নয়, ভিটামিন বি ১২-এরও একটি সমৃদ্ধ উৎস। নিয়মিত মাছ খেলে শরীরের বি ১২-এর চাহিদা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও পাওয়া যায়, যা হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।
ইলিশ মাছ
ইলিশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন বি ১২ থাকে। পাশাপাশি এতে স্বাস্থ্যকর চর্বি ও উচ্চমানের প্রোটিন রয়েছে। সপ্তাহে এক বা দুই দিন পরিমিত পরিমাণে ইলিশ খাওয়া উপকারী হতে পারে।
রুই মাছ
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছগুলোর একটি রুই। এতে ভালো মানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি ১২-ও পাওয়া যায়। প্রতিদিন না হলেও নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রুই মাছ রাখলে উপকার পাওয়া যায়।
টুনা মাছ
টুনা ভিটামিন বি ১২-এর অন্যতম সমৃদ্ধ উৎস। এটি শরীরের শক্তি ধরে রাখতে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক।
স্যামন মাছ
স্যামন মাছে ভিটামিন বি ১২-এর পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রচুর থাকে। এটি হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করে।
সার্ডিন
ছোট আকারের এই সামুদ্রিক মাছটি ভিটামিন বি ১২, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এরও ভালো উৎস।
কলিজা: সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাবার
যদি প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি ১২ থাকা খাবারের কথা বলা হয়, তাহলে গরু বা খাসির কলিজা তালিকার শীর্ষে থাকবে।
কলিজায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি ১২, আয়রন, ভিটামিন এ এবং ফলেট থাকে। তবে এতে কোলেস্টেরলের পরিমাণও বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা পরিমিত পরিমাণে সপ্তাহে একবার খেতে পারেন।
মাংস
গরু, খাসি ও মুরগির মাংসে ভিটামিন বি ১২ থাকে। বিশেষ করে লাল মাংসে এর পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
গরুর মাংস
গরুর মাংসে ভিটামিন বি ১২-এর পাশাপাশি জিঙ্ক, আয়রন ও উচ্চমানের প্রোটিন রয়েছে। তবে অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়ার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।
মুরগির মাংস
মুরগির মাংস তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত এবং এতে ভিটামিন বি ১২, প্রোটিন ও বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন পাওয়া যায়।
ডিম
ডিম সহজলভ্য এবং পুষ্টিকর একটি খাবার। বিশেষ করে ডিমের কুসুমে ভিটামিন বি ১২ বেশি থাকে।
নিয়মিত একটি বা দুটি ডিম খেলে শরীরের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি ১২-এরও একটি অংশ পূরণ হয়। শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং বয়স্কদের জন্যও এটি ভালো খাবার।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
যারা নিয়মিত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খান, তারা সহজেই কিছুটা ভিটামিন বি ১২ পেয়ে থাকেন।
দুধ
এক গ্লাস দুধে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন বি ১২ থাকে। পাশাপাশি এতে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিন ডি-ও থাকে।
দই
দই হজমের জন্য উপকারী এবং এতে থাকা বি ১২ শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে। প্রতিদিন এক বাটি টক দই খাওয়া স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে।
পনির
পনিরে ভিটামিন বি ১২-এর পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন রয়েছে। নিরামিষভোজীদের জন্য এটি ভালো একটি বিকল্প।
শামুক ও ঝিনুক
সামুদ্রিক শামুক ও ঝিনুকে অত্যন্ত বেশি পরিমাণে ভিটামিন বি ১২ থাকে। যেসব অঞ্চলে এগুলো সহজলভ্য, সেখানে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলে দ্রুত বি ১২-এর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
ফোর্টিফায়েড খাবার
যারা প্রাণিজ খাবার খান না, তাদের জন্য ফোর্টিফায়েড বা অতিরিক্ত ভিটামিন যুক্ত খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে:
- ফোর্টিফায়েড ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল
- ফোর্টিফায়েড সয়া দুধ
- ফোর্টিফায়েড ওট মিল্ক
- ফোর্টিফায়েড বাদাম দুধ
- নিউট্রিশনাল ইস্ট
এসব খাবার কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে “ভিটামিন বি ১২ যুক্ত” লেখা আছে কি না তা দেখে নেওয়া উচিত।
নিরামিষভোজীদের জন্য ভিটামিন বি ১২-এর সেরা উৎস
সম্পূর্ণ নিরামিষ খাদ্যে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন বি ১২ খুবই কম থাকে। তাই নিরামিষভোজীদের খাদ্য পরিকল্পনা একটু সচেতনভাবে করতে হয়।
যারা দুধ ও ডিম খান, তারা নিয়মিত নিচের খাবার রাখতে পারেন।
- দুধ
- দই
- পনির
- ডিম
- ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল
- ফোর্টিফায়েড উদ্ভিজ্জ দুধ
আর যারা সম্পূর্ণ ভেগান, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন বি ১২ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিদিন কত ভিটামিন বি ১২ প্রয়োজন?
ভিটামিন বি ১২-এর দৈনিক চাহিদা বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২.৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি ১২ প্রয়োজন। গর্ভাবস্থা ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এই চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়।
নিচে দৈনিক প্রয়োজনীয়তার সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়া হলো।
- ০ থেকে ৬ মাস: ০.৪ মাইক্রোগ্রাম
- ৭ থেকে ১২ মাস: ০.৫ মাইক্রোগ্রাম
- ১ থেকে ৩ বছর: ০.৯ মাইক্রোগ্রাম
- ৪ থেকে ৮ বছর: ১.২ মাইক্রোগ্রাম
- ৯ থেকে ১৩ বছর: ১.৮ মাইক্রোগ্রাম
- ১৪ বছর বা তার বেশি: ২.৪ মাইক্রোগ্রাম
- গর্ভবতী নারী: ২.৬ মাইক্রোগ্রাম
- স্তন্যদানকারী মা: ২.৮ মাইক্রোগ্রাম
প্রতিদিন সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে অধিকাংশ মানুষের এই চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
এক দিনের ভিটামিন বি ১২ সমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা
ভিটামিন বি ১২-এর চাহিদা পূরণের জন্য আলাদা বা ব্যয়বহুল খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের সাধারণ খাদ্যতালিকাতেই কিছু পরিবর্তন আনলেই যথেষ্ট।
সকালের নাশতা
এক গ্লাস দুধ, একটি সেদ্ধ ডিম এবং এক বাটি ওটস বা ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল দিয়ে দিনের শুরু করতে পারেন। এতে ভালো পরিমাণে ভিটামিন বি ১২, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
দুপুরের খাবার
ভাত বা রুটির সঙ্গে রুই, ইলিশ বা মুরগির মাংস, পাশাপাশি এক বাটি দই রাখতে পারেন। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টির পাশাপাশি ভিটামিন বি ১২-এরও ভালো উৎস পাওয়া যায়।
বিকেলের নাশতা
এক টুকরো পনির, দই অথবা এক গ্লাস দুধ খেতে পারেন। এতে ক্ষুধাও কমবে, আবার পুষ্টির ঘাটতিও পূরণ হবে।
রাতের খাবার
রাতে মাছ, ডিম বা মুরগির মাংসের সঙ্গে সবজি খেলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ খাবার তৈরি হয়। এটি শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা পূরণে সহায়তা করে।
রান্নার সময় কীভাবে ভিটামিন বি ১২ ধরে রাখবেন?
খাবারে থাকা ভিটামিন বি ১২ সংরক্ষণে রান্নার পদ্ধতিরও ভূমিকা রয়েছে। অতিরিক্ত তাপে দীর্ঘ সময় রান্না করলে কিছু পুষ্টি উপাদান নষ্ট হতে পারে।
ভিটামিন বি ১২ ধরে রাখতে নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন।
- খাবার অযথা বেশি সময় রান্না করবেন না।
- ডিপ ফ্রাইয়ের পরিবর্তে সেদ্ধ, ভাপ বা গ্রিল করা খাবার বেছে নিন।
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার অতিরিক্ত গরম করা এড়িয়ে চলুন।
- তাজা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
কারা ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি থাকে। এসব ব্যক্তির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং খাদ্য পরিকল্পনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন:
- ৫০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী
- নিরামিষভোজী ও ভেগান
- দীর্ঘদিন মেটফরমিন বা অ্যাসিড কমানোর ওষুধ সেবনকারীরা
- ক্রোনস ডিজিজ বা সিলিয়াক ডিজিজের রোগী
- যাদের পাকস্থলীর অস্ত্রোপচার হয়েছে
কখন ভিটামিন বি ১২ সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে?
সব মানুষের সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হয় না। যদি খাদ্য থেকেই পর্যাপ্ত ভিটামিন বি ১২ পাওয়া যায়, তাহলে আলাদা সাপ্লিমেন্টের দরকার নেই।
তবে নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন।
- রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতি ধরা পড়লে
- সম্পূর্ণ ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে
- দীর্ঘদিন শোষণজনিত সমস্যায় ভুগলে
- বয়স্কদের ক্ষেত্রে শোষণ কমে গেলে
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
ভিটামিন বি ১২ নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
অনেকেই ভিটামিন বি ১২ সম্পর্কে ভুল তথ্য বিশ্বাস করেন। এর মধ্যে কয়েকটি হলো:
শুধু নিরামিষভোজীদেরই বি ১২-এর ঘাটতি হয়
এটি পুরোপুরি সত্য নয়। অনেক আমিষভোজীরও শোষণজনিত কারণে বি ১২-এর ঘাটতি হতে পারে।
শরীরে দুর্বলতা মানেই বি ১২-এর অভাব
দুর্বলতার অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করা উচিত।
বেশি ভিটামিন খেলেই বেশি উপকার
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ সব সময় উপকারী নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার কোনগুলো?
মাছ, গরু ও খাসির কলিজা, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ডিম, দুধ, দই, পনির এবং ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল ভিটামিন বি ১২-এর ভালো উৎস।
ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতি হলে কী হয়?
ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, রক্তস্বল্পতা, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং স্নায়ুর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিরামিষভোজীরা কীভাবে ভিটামিন বি ১২ পাবেন?
দুধ, দই, পনির, ডিম, ফোর্টিফায়েড খাবার এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বি ১২ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।
প্রতিদিন কি ডিম খেলে ভিটামিন বি ১২-এর চাহিদা পূরণ হয়?
ডিমে ভিটামিন বি ১২ থাকলেও শুধুমাত্র ডিম থেকে সব মানুষের দৈনিক চাহিদা পূরণ নাও হতে পারে। তাই অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
ভিটামিন বি ১২ পরীক্ষা কীভাবে করা হয়?
সাধারণত রক্তের সিরাম ভিটামিন বি ১২ পরীক্ষা করে এর মাত্রা নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
উপসংহার
ভিটামিন বি ১২ শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন বি ১২ জাতীয় খাবার রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। মাছ, ডিম, দুধ, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবার নিয়মিত খেলে অধিকাংশ মানুষের চাহিদা পূরণ হয়।
আর যারা প্রাণিজ খাবার খান না, তারা ফোর্টিফায়েড খাবার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। কোনো ধরনের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।


