ডায়রিয়া হলে করণীয় কি, এটি অনেকেরই সাধারণ একটি প্রশ্ন। হঠাৎ পাতলা পায়খানা শুরু হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়, যা সময়মতো পূরণ না করলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়।
তবে সঠিক যত্ন না নিলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই লেখায় ডায়রিয়ার কারণ, লক্ষণ, ঘরোয়া পরিচর্যা, কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সবকিছু বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ডায়রিয়া কী?
ডায়রিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে স্বাভাবিকের তুলনায় বারবার পাতলা বা পানির মতো পায়খানা হয়। এটি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এর প্রধান কারণ হলেও ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, খাদ্যে বিষক্রিয়া, কিছু ওষুধ কিংবা হজমের সমস্যার কারণেও ডায়রিয়া হতে পারে।

ডায়রিয়া হলে করণীয় কি?
ডায়রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করা। পাশাপাশি সহজপাচ্য খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া জরুরি।
পর্যাপ্ত পানি ও স্যালাইন পান করুন
ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যায়। তাই অল্প অল্প করে বারবার বিশুদ্ধ পানি পান করুন। ওরাল স্যালাইন সবচেয়ে কার্যকর। এছাড়া ডাবের পানি বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয়ও গ্রহণ করা যেতে পারে।
সহজপাচ্য খাবার খান
পেটের ওপর চাপ কমাতে হালকা ও সহজে হজম হয় এমন খাবার বেছে নিন। যেমন:
- সাদা ভাত
- পাকা কলা
- আপেলের পিউরি
- টোস্ট
- সেদ্ধ আলু
- সেদ্ধ মুরগির মাংস
- পাতলা খিচুড়ি
এ ধরনের খাবার ধীরে ধীরে মল শক্ত হতে সাহায্য করতে পারে।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
ডায়রিয়ার সময় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম না করে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। এতে শরীর দ্রুত সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
ডায়রিয়া হলে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
সঠিক খাদ্যাভ্যাস দ্রুত সুস্থ হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যেসব খাবার উপকারী
- ভাত
- কলা
- ওটস
- স্যুপ
- সেদ্ধ ডিম
- সেদ্ধ মাছ
- দই (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)
খাবার অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
ডায়রিয়া হলে যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
কিছু খাবার ডায়রিয়ার উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলুন।
- অতিরিক্ত তেল ও মসলাযুক্ত খাবার
- ভাজাপোড়া
- কোমল পানীয়
- অতিরিক্ত চা ও কফি
- অ্যালকোহল
- অতিরিক্ত দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (যদি সহ্য না হয়)
- কাঁচা বা অপরিষ্কার খাবার
ডায়রিয়ার সাধারণ কারণ
ডায়রিয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কারণ জানা থাকলে চিকিৎসা ও প্রতিরোধ দুটোই সহজ হয়।
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে ডায়রিয়া হয়। এছাড়া দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলেও পাতলা পায়খানা হতে পারে।
খাদ্যে বিষক্রিয়া
নষ্ট বা অপরিষ্কার খাবার খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়ার পাশাপাশি বমি, পেটব্যথা ও জ্বরও দেখা দিতে পারে।
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ডায়রিয়া হতে পারে। কিছু অ্যান্টাসিড ও অন্যান্য ওষুধও একই সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
খাদ্য অসহিষ্ণুতা
অনেকের শরীর দুধের ল্যাকটোজ বা গমের গ্লুটেন ঠিকভাবে হজম করতে পারে না। এসব খাবার খাওয়ার পর ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।
ডায়রিয়ার লক্ষণ
ডায়রিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো বারবার পাতলা পায়খানা হওয়া। এর পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
- পেটে ব্যথা বা মোচড়
- পেট ফাঁপা
- বমি বমি ভাব
- দুর্বল লাগা
- ঘন ঘন পায়খানার চাপ
গুরুতর ক্ষেত্রে জ্বর, রক্তমিশ্রিত পায়খানা বা তীব্র পানিশূন্যতাও দেখা দিতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সব ধরনের ডায়রিয়ায় হাসপাতালে যেতে হয় না। তবে নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- ডায়রিয়া তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে
- বারবার বমি হলে
- উচ্চ জ্বর থাকলে
- পায়খানার সঙ্গে রক্ত বা অতিরিক্ত শ্লেষ্মা বের হলে
- প্রস্রাব কমে গেলে
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি হলে
- শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তির পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে
শিশুদের ডায়রিয়া হলে করণীয়
শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ তারা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
শিশুকে বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বড় শিশুদের ওরাল স্যালাইন অল্প অল্প করে খাওয়ানো উচিত। শিশুর প্রস্রাব কমে গেলে, কান্নার সময় চোখে পানি না এলে, অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়লে বা খাওয়া বন্ধ করে দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
ডায়রিয়া প্রতিরোধের উপায়
ডায়রিয়া পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস মেনে চললে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।
নিয়মিত হাত ধুয়ে নিন
খাবার খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পরে এবং রান্নার আগে সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। এটি জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পান করুন
সবসময় পরিষ্কার ও ভালোভাবে রান্না করা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। বাইরে খাওয়ার সময় খাবারের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বিশুদ্ধ বা ফুটানো পানি পান করুন।
ভ্রমণের সময় সতর্ক থাকুন
অপরিচিত স্থানে ভ্রমণের সময় বোতলজাত বা ফুটানো পানি পান করুন। কাঁচা সালাদ, অপরিষ্কার ফল এবং আধা-সেদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে হজমতন্ত্র সুস্থ থাকে এবং ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমে।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ডায়রিয়া হলে প্রথমে কী করা উচিত?
প্রথমেই পর্যাপ্ত ওরাল স্যালাইন বা বিশুদ্ধ পানি পান শুরু করুন। শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়রিয়া কতদিন স্থায়ী হতে পারে?
সাধারণত তীব্র ডায়রিয়া ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডায়রিয়ার সময় দুধ খাওয়া যাবে?
অনেকের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার সময় দুধ হজমে সমস্যা হতে পারে। তাই সাময়িকভাবে দুধ এড়িয়ে চলা ভালো। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দই খাওয়া যেতে পারে।
ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক কি সব সময় প্রয়োজন?
না। সব ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
ডায়রিয়া হলে কখন হাসপাতালে যেতে হবে?
উচ্চ জ্বর, রক্তমিশ্রিত পায়খানা, তীব্র পানিশূন্যতা, বারবার বমি অথবা কয়েক দিনের বেশি ডায়রিয়া চলতে থাকলে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
উপসংহার
ডায়রিয়া হলে করণীয় কি, এর সহজ উত্তর হলো শরীরের পানির ঘাটতি পূরণ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং সহজপাচ্য খাবার খাওয়া।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে জ্বর, রক্তমিশ্রিত পায়খানা বা তীব্র পানিশূন্যতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
সঠিক পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দ্রুত সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডায়রিয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।


