এক্টোলাইফ: যন্ত্রের ‘গর্ভে’ মানবশিশু

বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির দুনিয়াটা বড়ই অদ্ভুত, তাই না? প্রতিনিয়ত এমন সব খবর আমাদের কানে আসে, যা শুনে কখনও অবাক হই, কখনও বা একটু থমকে দাঁড়াই।

মনে হয়, আরে! এটা কি আসলেই সম্ভব? এমনই এক ধারণা, যা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বেশ আলোচনা চলছে, তার নাম হলো এক্টোলাইফ (EctoLife)।


ব্যাপারটা কী? সহজ করে বললে, এটা এমন এক ভবিষ্যতের ছবি আঁকছে, যেখানে শিশুরা মায়ের গর্ভে নয়, বরং বিশেষ এক ধরনের যন্ত্রের ভেতর, অনেকটা কাঁচের বাক্সের মতো দেখতে ‘বেবি পড’-এ বেড়ে উঠবে।

মানে, পুরো নয় মাস সময়কালটাই কাটবে ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে! শুনেই হয়তো আপনার কপালে ভাঁজ পড়ল, মনে হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

এটাই স্বাভাবিক। চলুন, এই একটোলাইফের ধারণাটাকে একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক – এর ভেতরে কী আছে, কী নেই, সম্ভাবনা কতটুকু, আর সংশয়ই বা কোথায়?

১. একটোলাইফ আসলে কী?

এক্টোলাইফ কোনো চালু হওয়া প্রযুক্তি বা প্রজেক্ট নয়। এটা মূলত বার্লিন-ভিত্তিক একজন বিজ্ঞান কমিউনিকেটর, হাশেম আল-ঘাইলি’র একটি কনসেপ্ট বা ধারণা, যা তিনি একটি অ্যানিমেটেড ভিডিওর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই ধারণার জন্ম শূন্য থেকে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের গবেষণা এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অগ্রগতি:

কৃত্রিম গর্ভাশয় (Artificial Womb/Biobag):

বিজ্ঞানীরা বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টা করছেন অপরিণত প্রাণীর ভ্রূণকে (যেমন, ভেড়া) শরীরের বাইরে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিকশিত করতে। ফিলাডেলফিয়ার চিলড্রেনস হসপিটালের গবেষকরা এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা এগিয়েছেন। তারা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগের মতো যন্ত্র তৈরি করেছেন, যেখানে অপরিণত ভেড়ার ভ্রূণ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়ে উঠতে পেরেছে। যদিও মানুষের জন্য এটা এখনো অনেক জটিল এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে।

আইভিএফ (In-Vitro Fertilization):

ল্যাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরির এই প্রযুক্তি তো আমরা জানিই। একটোলাইফের শুরুটা হবে এখান থেকেই।

টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং ও পুষ্টি সরবরাহ:


কৃত্রিম গর্ভে মায়ের প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মতো কাজ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা ভ্রূণকে নিখুঁত পরিমাণে পুষ্টি ও অক্সিজেন দেবে এবং বর্জ্য সরিয়ে নেবে। এর জন্য টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কৃত্রিম রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

সেন্সর ও মনিটরিং:

শিশুর প্রতিটি মুহূর্তের বৃদ্ধি (হার্টবিট, তাপমাত্রা, নড়াচড়া, মস্তিষ্কের বিকাশ) পর্যবেক্ষণ করার জন্য অত্যাধুনিক মাইক্রো-সেন্সর এবং এআই (Artificial Intelligence) ভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম দরকার হবে।
এক্টোলাইফের ধারণা অনুযায়ী, এই সবগুলো প্রযুক্তিকে এক ছাদের নিচে এনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে শত শত বা হাজার হাজার ‘বেবি পড’ একসঙ্গে কাজ করবে।

এক্টোলাইফ: যন্ত্রের ‘গর্ভে’ মানবশিশু

২. প্রক্রিয়াটা কেমন হতে পারে? – একটি সম্ভাব্য চিত্র

চলুন কল্পনা করি, যদি একটোলাইফ বাস্তবে আসে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটা কেমন হতে পারে:

প্রথম ধাপ (আইভিএফ ও নির্বাচন):

বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ল্যাবে নিষিক্ত করা হবে। এরপর হয়তো জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে সুস্থ ও সবল ভ্রূণটিকে বেছে নেওয়া হবে (এখানেই জিনগত রোগ বাদ দেওয়ার বা বৈশিষ্ট্য নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসে)।

দ্বিতীয় ধাপ (পডে স্থাপন):

নির্বাচিত ভ্রূণটিকে সযত্নে একটি ‘গ্রোথ পড’-এ স্থাপন করা হবে। এই পডটি জীবাণুমুক্ত এবং বিশেষভাবে তৈরি তরলে পূর্ণ থাকবে, যা মায়ের গর্ভের অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের মতো কাজ করবে।

তৃতীয় ধাপ (বৃদ্ধি ও পর্যবেক্ষণ):

পডের ভেতরে ভ্রূণটি বেড়ে উঠতে শুরু করবে। একটি কৃত্রিম আম্বিলিক্যাল কর্ডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় পুষ্টি, হরমোন, অ্যান্টিবডি এবং অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে। একইসাথে, শিশুর শরীর থেকে উৎপন্ন কার্বন ডাইঅক্সাইড ও অন্যান্য বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হবে। পডের ভেতরের পরিবেশ (তাপমাত্রা, চাপ) সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রিত থাকবে। অত্যাধুনিক সেন্সর শিশুর গুরুত্বপূর্ণ সব লক্ষণ (vital signs) পর্যবেক্ষণ করবে এবং কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে অ্যালার্ম দেবে।

চতুর্থ ধাপ (বাবা-মায়ের সংযোগ):

ধারণা করা হচ্ছে, বাবা-মায়েরা একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক শিশুর ডেটা দেখতে পারবেন। তারা হয়তো শিশুর লাইভ ভিডিও দেখতে পারবেন, এমনকি পডের স্পিকারের মাধ্যমে শিশুর সাথে কথা বলতে বা গান শোনাতে পারবেন। পডের ভেতরে এমন ব্যবস্থা রাখা হতে পারে, যা মায়ের হৃদস্পন্দনের শব্দ অনুকরণ করে শিশুকে শোনানো হবে, যাতে সে একটি পরিচিত স্পন্দন অনুভব করে।

পঞ্চম ধাপ (জন্ম):

যখন শিশুটি পূর্ণতা পাবে (প্রায় ৯ মাস পর), তখন কোনো প্রসব বেদনা বা অস্ত্রোপচার ছাড়াই, খুব সহজ প্রক্রিয়ায় পড থেকে শিশুটিকে বের করে এনে বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হবে।


৩. সম্ভাবনার আলো: কেন এই ধারণা নিয়ে এত আলোচনা?

এক্টোলাইফের প্রবক্তারা বেশ কিছু সম্ভাব্য সুবিধার কথা বলছেন:

বন্ধ্যাত্ব সমস্যার সমাধান:

বিশ্বজুড়ে বহু দম্পতি সন্তান ধারণে ব্যর্থ হচ্ছেন। একটোলাইফ তাদের জন্য আশার আলো হতে পারে।

মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা:

গর্ভধারণ এবং প্রসব অনেক নারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে (যেমন: একলাম্পসিয়া, গর্ভপাত, প্রসবকালীন জটিলতা)। একটোলাইফ এই ঝুঁকিগুলো শূন্যে নামিয়ে আনতে পারে।

বংশগত রোগ নির্মূল:

জিন সম্পাদনার (যেমন CRISPR) মাধ্যমে ভ্রূণ অবস্থাতেই মারাত্মক জেনেটিক রোগ (থ্যালাসেমিয়া, হান্টিংটন ডিজিজ ইত্যাদি) সারিয়ে তোলা বা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

অপরিণত শিশুর উন্নত পরিচর্যা:

সময়ের আগে জন্ম নেওয়া (প্রি-ম্যাচিওর) শিশুদের ইনকিউবেটরে অনেক জটিলতার ঝুঁকি থাকে। কৃত্রিম গর্ভ হয়তো তাদের জন্য আরও নিরাপদ ও কার্যকর পরিবেশ দিতে পারবে।

সুবিধা ও স্বাধীনতা:

যেসব নারী ক্যারিয়ার বা অন্যান্য কারণে গর্ভধারণ করতে চান না বা পারেন না, তারাও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সন্তান লাভ করতে পারেন। সমকামী পুরুষ দম্পতিদের জন্যও এটি একটি বিকল্প হতে পারে।

ক্যান্সার বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত নারী:

যেসব নারীর জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে বা কেমোথেরাপির কারণে গর্ভধারণ ক্ষমতা হারিয়েছেন, তারাও মা হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

৪. উদ্বেগের ছায়া: কী কী প্রশ্ন উঠছে?

যেকোনো বৈপ্লবিক ধারণার সাথেই কিছু গভীর প্রশ্ন আর উদ্বেগ জড়িয়ে থাকে। একটোলাইফও এর ব্যতিক্রম নয়:
প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মায়ের গর্ভের সেই জটিল, জীবন্ত এবং আত্মিক পরিবেশকে কি যন্ত্র দিয়ে পুরোপুরি নকল করা সম্ভব? মায়ের শরীরের হরমোন, আবেগ, স্পর্শ, খাদ্যাভ্যাস – এগুলোর যে সূক্ষ্ম প্রভাব শিশুর বিকাশে পড়ে, তা কি কৃত্রিম পরিবেশে পাওয়া যাবে?

নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:

প্রযুক্তি কি ১০০% নিরাপদ হবে? যান্ত্রিক ত্রুটি, সাইবার অ্যাটাক বা অজানা কোনো কারণে শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কি থাকবে না? এভাবে জন্ম নেওয়া শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব পড়বে, তা জানার জন্য কয়েক দশক বা প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হতে পারে।

নৈতিকতার সীমানা:

জিন সম্পাদনার সুযোগ কি কেবল রোগ নিরাময়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি মানুষ বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য, উচ্চতার মতো বৈশিষ্ট্য ‘অর্ডার’ দিয়ে ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরি করতে শুরু করবে? এটা কি মানব প্রজাতিকে জেনেটিক্যালি দুই ভাগে (উন্নত ও সাধারণ) ভাগ করে ফেলবে না?

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য:

এই প্রযুক্তি যদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়, তবে তা কেবল ধনী শ্রেণীর নাগালেই থাকবে। ফলে, স্বাস্থ্য ও সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়বে।

মাতৃত্ব, পিতৃত্ব ও পরিবারের ধারণা:

একটোলাইফ কি মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের সংজ্ঞাকে বদলে দেবে? মা ও শিশুর মধ্যেকার সেই অবিচ্ছেদ্য বাঁধন কি দুর্বল হয়ে পড়বে? পরিবারের গঠন ও ধারণার উপর এর প্রভাব কী হবে?

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব:

যন্ত্রের ভেতর বেড়ে ওঠা শিশুরা কি স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ লাভ করবে? তাদের আত্মপরিচয়, সামাজিকীকরণ, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তায় কোনো পার্থক্য দেখা দেবে?

৫. একটোলাইফে জন্ম নেওয়া শিশুরা কেমন হতে পারে?

যদি এই প্রযুক্তি সফল হয়, তবে এই শিশুদের কিছু সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে:

শারীরিক স্বাস্থ্য:

হয়তো তারা নির্দিষ্ট কিছু বংশগত রোগ থেকে মুক্ত হবে। নিয়ন্ত্রিত পুষ্টি ও পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে জন্মকালীন কিছু জটিলতা এড়ানো যেতে পারে।

জিনগত প্রোফাইল:

যদি জিন সম্পাদনা করা হয়, তবে তাদের জিনে সেই পরিবর্তনগুলো থাকবে।

মানসিক ও আবেগিক গঠন:

এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। মায়ের গর্ভের অবিরাম সান্নিধ্য, স্পন্দন, আবেগীয় মিথস্ক্রিয়া ছাড়া বেড়ে ওঠার প্রভাব তাদের মানসিক ও সামাজিক আচরণে কেমন হবে, তা কেবল সময়ই বলতে পারবে। তাদের হয়তো পৃথিবীতে খাপ খাইয়ে নিতে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।

শেষ কথা: ভাবনা আপনার হাতে

প্রিয় পাঠক, একটোলাইফ এখনও ভবিষ্যতের পাতায় লেখা একটি অধ্যায়। এটা বাস্তবায়িত হবে কিনা, হলে কবে হবে, কেমন রূপে হবে – তা এখনই বলা মুশকিল।

তবে এই ধারণাটি আমাদের অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। বিজ্ঞান কোথায় যাচ্ছে, আমরা প্রযুক্তির সাহায্যে জীবনকে কতটা বদলাতে চাই, আর সেই বদলের সম্ভাব্য মূল্যই বা কী হতে পারে – এসব প্রশ্ন এখন আমাদের সামনে।

এক্টোলাইফ একদিকে যেমন বিশাল সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখে। এটা কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, এটা আমাদের মানব হওয়ার অর্থ, পরিবার, সমাজ এবং প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ্য।

এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তিই দেওয়া যায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন আরও গবেষণা, আরও আলোচনা এবং প্রতিটি দিক সতর্কভাবে বিবেচনা করা। প্রযুক্তি এগিয়ে যাক, কিন্তু তা যেন আমাদের মানবিকতাকে ছাপিয়ে না যায়, সেটাই হয়তো মূল কথা।

মতামত জানান

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top