আজ আমরা আলোচনা করব “আখেরি চাহার সোম্বা” নিয়ে। এটি আসলে কি, কেন পালন করা হয়? পালন করার বিধান কি?
আখেরি চাহার সোম্বা কী?
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো শেষ বুধবার।
- আখেরি মানে শেষ।
- চাহার সোম্বা মানে বুধবার।
অর্থাৎ, আখেরি চাহার সোম্বা বলতে বোঝানো হয় হিজরী বর্ষের সফর মাসের শেষ বুধবার।
আমাদের দেশে এই দিনটিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হয় এবং এ উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের আমল ও উদযাপন করা হয়। এমনকি সরকারি ছুটিও পালন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো – আসলে কি এ দিনের ইসলামে কোনো বিশেষ তাৎপর্য আছে?

মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস
অনেকে মনে করেন, সফর মাসের শেষ দিকে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাঃ অসুস্থতা থেকে কিছুটা আরোগ্য লাভ করেছিলেন এবং সেই দিনটি ছিল বুধবার। এজন্য কেউ কেউ দাবি করেন, এ দিন আনন্দ প্রকাশ করা উচিত, বিশেষ নামাজ পড়া উচিত এবং সৎকর্ম করা উচিত।
তারা আরও বলে থাকেন, সাহাবায়ে কেরামও নাকি এ দিনকে বিশেষভাবে পালন করেছিলেন। এজন্য বিভিন্ন কিতাবে, খুতবায় এবং গণমাধ্যমে এ দিনকে কেন্দ্র করে নানা কর্মসূচি ও রীতি প্রচলিত হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে বাস্তবতা
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, এ দাবিগুলো যাচাই করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়:
১. নবী সাঃ এর আরোগ্য লাভের দিন
হ্যাঁ, ইতিহাসে প্রমাণিত যে নবী সাঃ মৃত্যুবরণের আগে অসুস্থ ছিলেন এবং সফর মাসের শেষ দিকে কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন। তবে, এটি যে বুধবার ছিল – এমন কোনো সহীহ হাদীস নেই।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এবং ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) এর মতো মহান ইতিহাসবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নেই।
বরং কিছু বর্ণনা থেকে জানা যায় যে আরোগ্যের দিনটি বৃহস্পতিবার ছিল। সুতরাং বুধবার আরোগ্য লাভের কথা বলা ভিত্তিহীন ও মনগড়া।
২. সাহাবায়ে কেরামের উদযাপন
কোনো সহীহ হাদীস বা নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে সাহাবায়ে কেরাম এ দিনকে আনন্দের সঙ্গে পালন করেছিলেন বা বিশেষ কোনো আমল করেছিলেন।
৩. ভ্রান্ত বই ও কিতাবের প্রচলন
কিছু দুর্বল ও অবিশ্বস্ত কিতাবে সফর মাসের শেষ বুধবারের জন্য বিশেষ নামাজ, সূরা ইখলাস বারবার পড়া, বিশেষ দুরুদ ও দোয়া পাঠ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ইসলামের স্বীকৃত আলেম এসব বর্ণনাকে অসহীহ ও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করেছেন।
নবী সাঃ এর জীবনের বাস্তব ঘটনা
নবী সাঃ এর জীবনে অনেকবার আল্লাহর সাহায্যে বিপদ থেকে মুক্তি পেয়েছেন – হিজরতের সময় গুহায় আশ্রয় নেওয়া, যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য লাভ করা ইত্যাদি।
কিন্তু সেসব ঘটনার কোনো একটি দিনকেও তিনি বা সাহাবায়ে কেরাম স্মরণীয় দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেননি।
তাই আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ আমল বা উৎসবের দিন হিসেবে পালনের কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।
ইসলাম কী বলে?
ইসলাম মানে হলো কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুসরণ করা। রাসূল সাঃ সাহাবায়ে কেরাম এবং প্রকৃত সালাফদের আদর্শ মেনে চলা। কোনো মনগড়া কাজ ইসলাম নয়। বরং তা বিদআত, যা পরিত্যাজ্য।
উপসংহার
সফর মাসের শেষ বুধবার নবী সাঃ আরোগ্য লাভ করেছিলেন – এ দাবি প্রমাণিত নয়। সে দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজ, দোয়া বা কর্মসূচি পালন করা – সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
সাহাবায়ে কেরাম কিংবা তাবেঈন – কেউই এ দিনকে উদযাপন করেননি। অতএব, আমাদের উচিত কুরআন ও সহীহ হাদীসকে অনুসরণ করা, বিদআত থেকে বেঁচে থাকা এবং মনগড়া আমল পরিহার করা।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সত্য গ্রহণ ও ভ্রান্তি থেকে বিরত থাকার তাওফিক দিন।
আর্টিকেলটি শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য থেকে তুলে ধরা হয়েছে। নিচে সম্পুর্ণ ভিডিওটি যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।


