দীর্ঘ সময় মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকার পর জমজম কূপের অবস্থান পুনরায় শনাক্ত করার ঘটনা ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কার জনপদে নানা পরিবর্তন, গোত্রের উত্থান-পতন এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে একসময় কূপটির চিহ্ন পর্যন্ত হারিয়ে যায়।
আল্লামা ইয়াকূত হামাভী তাঁর ‘মু’জামুল বুলদান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, অবহেলার কারণে জমজম কূপের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং একপর্যায়ে এর অবস্থানের চিহ্নও মুছে যায়। ঐতিহাসিকদের একটি মত হলো, মক্কার দীর্ঘদিনের অধিপতি জুরহুম গোত্র বিদায়ের সময় কূপটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। তাদের নেতা মুযায ইবনে জুরহুম এ কাজে নেতৃত্ব দেন বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
জুরহুম গোত্র মক্কা ছাড়ার আগে কাবা শরিফের কিছু মূল্যবান উপঢৌকন এবং দুটি স্বর্ণের হরিণও কূপের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। তাদের ধারণা ছিল, ভবিষ্যতে মক্কার কর্তৃত্ব ফিরে পেলে এসব সম্পদ আবার উদ্ধার করা সম্ভব হবে। পরে খুযাআ গোত্র মক্কার নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
এই সময়ের মধ্যে জমজম কূপের সঠিক অবস্থান মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবের সময় পর্যন্ত কেউ কূপটি পুনরুদ্ধার করতে পারেননি বলে বর্ণনা রয়েছে।
তখন আবদুল মুত্তালিব হাজিদের পানি সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। জমজম কূপের অবস্থান অজানা থাকায় তাঁকে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি এনে হাজিদের পান করাতে হতো। কাজটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এ পরিস্থিতিতে তিনি মনে মনে কামনা করতেন, তাঁর যদি দশজন শক্তিশালী পুত্র থাকত, তাহলে তাঁদের সহায়তায় কূপটি খুঁজে বের করা সহজ হতো।
এরপর তিনি মানত করেন, আল্লাহ তাঁকে দশজন পুত্রসন্তান দান করলে তাঁদের একজনকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করবেন। কিছুদিন পর থেকেই তাঁর জীবনে শুরু হয় একের পর এক তাৎপর্যপূর্ণ স্বপ্নের ঘটনা।
প্রথম রাতে তিনি স্বপ্নে শুভ্রকেশ এক নূরানি ব্যক্তিত্বকে দেখতে পান। ওই ব্যক্তি তাঁকে বলেন, ‘তাইবা’ খনন করতে। আবদুল মুত্তালিব জানতে চান, তাইবা কী। কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে সেই ব্যক্তি অদৃশ্য হয়ে যান।
পরের রাতেও একই ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা যায়। এবার নির্দেশ আসে ‘বাররাহ’ খননের। একই প্রশ্নের পরও কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। তৃতীয় রাতেও একইভাবে ‘আল-মাযনূনা’ খননের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরপর তিন রাত একই ধরনের স্বপ্ন দেখার পর আবদুল মুত্তালিব বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকেন। নামগুলো তাঁর কাছে অপরিচিত হওয়ায় তিনি নির্দেশের অর্থ বুঝতে পারছিলেন না।
চতুর্থ রাতে আবার সেই নূরানি ব্যক্তিত্ব স্বপ্নে এসে এবার সরাসরি বলেন, ‘জমজম খনন করো।’ জমজম নামটি পরিচিত হওয়ায় আবদুল মুত্তালিব কূপটির অবস্থান জানতে চান।
তখন তাঁকে জানানো হয়, এটি এমন একটি কূপ, যা কখনো সম্পূর্ণ ভরাট হবে না এবং যার পানি শুকিয়ে যাবে না। কাবা শরিফের জিয়ারতকারীদের জন্য এ পানি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে কূপটির অবস্থান শনাক্ত করার জন্য কিছু নিদর্শনও জানানো হয়।
স্বপ্নে বলা হয়, যেখানে পশুর গোবর, রক্ত ও মাংসের চিহ্ন রয়েছে, সেখানেই কূপটির অবস্থান। আরও বলা হয়, সেখানে সাদা পালকের পাখিদের আনাগোনা এবং পিঁপড়াদের খাদ্যকণা নিয়ে গর্তে ঢোকার দৃশ্য দেখা যাবে।
এই ইঙ্গিতের সঙ্গে এমন একটি স্থানকে সম্পর্কিত করা হয়, যেখানে পশু জবাই করা হতো। দীর্ঘদিন কূপটির অবস্থান বিস্মৃত হয়ে যাওয়ায় মানুষ অজান্তেই সেই জায়গা পশু জবাইয়ের কাজে ব্যবহার করত বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
জমজম কূপের নাম নিয়েও ইতিহাসে একাধিক উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘শাব্বাআ’, ‘বাররাহ’, ‘তাইবা’, ‘আওয়ানা’, ‘সাফিয়া’, ‘বুশরা’, ‘আবরার’ ও ‘আল-মাযনূনা’ নামগুলো বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। ‘জমজম’ নামটির সঙ্গে পানির প্রাচুর্য ও সমাবেশের অর্থের সম্পর্ক রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
হজরত হাজেরা আলাইহাস সালামের সময় পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কূপের চারপাশে মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরির ঘটনার সঙ্গেও ‘জমজম’ নামের উৎপত্তিকে কেউ কেউ যুক্ত করেছেন। তবে কূপটির বিভিন্ন নামের পেছনে মক্কার দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন সময়ের পরিবর্তন এবং গোত্রগুলোর প্রভাবের বিষয়ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় উঠে এসেছে।
হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পর দীর্ঘ সময় কাবা শরিফের তত্ত্বাবধান জুরহুম গোত্রের হাতে ছিল। আমালিকা গোত্রকে পরাজিত করার পর তারা মক্কার কর্তৃত্ব নেয়। একপর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি হলেও পরে তারা আরাম-আয়েশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং জমজম কূপের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা করতে থাকে। নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে কূপটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে বর্ণনা রয়েছে।
পরে খুযাআ গোত্র মক্কার কর্তৃত্ব নেওয়ার উদ্যোগ নিলে জুরহুম নেতা মুযায পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। কিন্তু তাঁর গোত্রের লোকেরা সতর্কবার্তায় সাড়া দেয়নি। এরপরই তিনি কাবা শরিফের মূল্যবান কিছু সম্পদ এবং দুটি স্বর্ণের হরিণ জমজম কূপে লুকিয়ে রেখে গোত্রের লোকজন ও হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশধরদের নিয়ে মক্কা ত্যাগ করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের পর আবদুল মুত্তালিবের কাছে স্বপ্নে জমজমের অবস্থান শনাক্ত করার নির্দেশ আসে। স্বপ্নের ইঙ্গিতকে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেন। তবে তিনি একাই এ কাজ করার সিদ্ধান্ত নেননি। নিজের গোত্রের মধ্যে কূপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে বিবেচনায় নিয়ে তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে জমজম কূপ পুনঃখননের উদ্যোগ নেন।


