শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধই সবচেয়ে নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সহজপাচ্য খাবার। কিন্তু অনেক মা হঠাৎ লক্ষ্য করেন যে আগের মতো বুকে দুধ আসছে না বা দুধের পরিমাণ কমে গেছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, বুকের দুধ শুকিয়ে যায় কেন?
এটি কি কোনো রোগের লক্ষণ, নাকি জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসের কারণে এমনটি হয়? বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুকের দুধ পুরোপুরি শুকিয়ে যায় না। বরং কিছু নির্দিষ্ট কারণের জন্য দুধের উৎপাদন সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।
সুখবর হলো, সঠিক নিয়ম মেনে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক স্বস্তি বজায় রাখলে অনেক ক্ষেত্রেই দুধের পরিমাণ আবার বাড়ানো সম্ভব। এই লেখায় বুকের দুধ কমে যাওয়ার কারণ, লক্ষণ এবং কার্যকর সমাধান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

বুকের দুধ শুকিয়ে যায় কেন?
বুকের দুধ তৈরি হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, প্রোল্যাকটিন ও অক্সিটোসিনের ওপর নির্ভর করে।
শিশু যত বেশি বুকের দুধ পান করে, তত বেশি এই হরমোনগুলো সক্রিয় হয় এবং দুধ উৎপাদনও বাড়ে। বিপরীতে শিশুর দুধ খাওয়ার পরিমাণ কমে গেলে বা দীর্ঘ সময় বুকের দুধ না খাওয়ালে ধীরে ধীরে দুধের উৎপাদনও কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া আরও কিছু কারণ রয়েছে যা বুকের দুধ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।
বুকের দুধ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ
শিশুকে পর্যাপ্ত সময় বুকের দুধ না খাওয়ানো
বুকের দুধ উৎপাদনের সবচেয়ে বড় উদ্দীপনা হলো শিশুর চোষা। যদি শিশু ঘন ঘন বুকের দুধ না খায়, তাহলে শরীর বুঝতে পারে যে এত দুধের প্রয়োজন নেই। ফলে ধীরে ধীরে দুধ তৈরি কমে যায়।
জন্মের পর দেরিতে বুকের দুধ শুরু করা
প্রসবের পর প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করলে দুধ উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অযথা দেরি হলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।
ফর্মুলা দুধ বা বোতলের ওপর নির্ভরতা
শিশু যদি নিয়মিত ফর্মুলা দুধ বা ফিডার ব্যবহার করে, তাহলে সে বুকের দুধ কম পান করবে। এতে মায়ের শরীরে দুধ তৈরির সংকেতও কম পৌঁছায় এবং দুধের পরিমাণ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
ভুলভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো
শিশুর মুখ ঠিকভাবে স্তনে না লাগলে সে পর্যাপ্ত দুধ টানতে পারে না। ফলে স্তন পুরোপুরি খালি হয় না এবং নতুন দুধ উৎপাদনের হারও কমে যায়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা মানসিক চাপ অক্সিটোসিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে দুধ বের হতে সমস্যা হয় এবং অনেক সময় মায়ের মনে হয় দুধ শুকিয়ে যাচ্ছে।
পর্যাপ্ত খাবার ও পানি না খাওয়া
দুধ উৎপাদনের জন্য শরীরের অতিরিক্ত শক্তি ও তরলের প্রয়োজন হয়। মা যদি পর্যাপ্ত পানি, প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার না খান, তাহলে দুধের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব
নবজাতকের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক মা ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্যও প্রভাবিত হতে পারে।
শিশুটি পর্যাপ্ত বুকের দুধ পাচ্ছে কিনা বুঝবেন কীভাবে?
অনেক মা মনে করেন শিশু কান্না করলেই তার দুধ কম পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কান্নার আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে শিশুটি সত্যিই পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ বার প্রস্রাব না করা।
- জন্মের পর স্বাভাবিক সময় পার হওয়ার পরও ওজন না বাড়া।
- দুধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পরই বারবার ক্ষুধার্ত হয়ে পড়া।
- শিশু সবসময় অস্থির থাকা এবং দীর্ঘ সময় ক্ষুধার লক্ষণ দেখানো।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বুকের দুধ কীভাবে তৈরি হয়?
শিশু যখন মায়ের স্তন চুষে, তখন মস্তিষ্ক থেকে প্রোল্যাকটিন ও অক্সিটোসিন নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত হয়।
প্রোল্যাকটিনের কাজ
প্রোল্যাকটিন স্তনের দুধ উৎপাদনকারী কোষকে সক্রিয় করে নতুন দুধ তৈরি করে। শিশুকে যত বেশি বুকের দুধ খাওয়ানো হবে, এই হরমোন তত বেশি কাজ করবে।
অক্সিটোসিনের কাজ
অক্সিটোসিন স্তনের ভেতরে তৈরি হওয়া দুধ বাইরে বের হতে সাহায্য করে। মায়ের মানসিক স্বস্তি, শিশুর স্পর্শ, এমনকি শিশুর কান্নার শব্দও এই হরমোন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে।
বুকের দুধ বাড়ানোর কার্যকর উপায়
শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ান
শিশুর চাহিদা অনুযায়ী দিনে ও রাতে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান। বিশেষ করে রাতের বেলায় দুধ খাওয়ালে প্রোল্যাকটিন বেশি নিঃসৃত হয়।
প্রতিবার একটি স্তন সম্পূর্ণ খালি করুন
একবার খাওয়ানোর সময় একটি স্তনের দুধ ভালোভাবে শেষ হতে দিন। এরপর প্রয়োজন হলে অন্য স্তন দিন। এতে শিশুটি পুষ্টিকর ঘন দুধও পাবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। পাশাপাশি দুধ, স্যুপ, ডাবের পানি বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর তরল খাবারও উপকারী হতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার খান
প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় রাখুন।
- ডিম
- মাছ
- মাংস
- ডাল
- দুধ
- সবুজ শাকসবজি
- ফলমূল
- বাদাম
এসব খাবার শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকুন
পরিবারের সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ইতিবাচক মানসিক পরিবেশ বুকের দুধ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
দুধের পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরে কম থাকলে বা শিশু ওজন না বাড়ালে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ বা স্তন্যদান বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বুকের দুধ বাড়াতে কোন খাবার উপকারী?
কিছু খাবার অনেক মায়ের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। যেমন,
- লাউ
- কালোজিরা
- ওটস
- মেথি
- মৌরি
- দুধ
- খেজুর
তবে শুধু এসব খাবারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি এবং নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- শিশুর ওজন বাড়ছে না।
- দিনে ৬ বারের কম প্রস্রাব করছে।
- শিশুর মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।
- মায়ের স্তনে তীব্র ব্যথা, জ্বর বা ফোলা রয়েছে।
- দীর্ঘদিন ধরে বুকের দুধ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কি আবার আসতে পারে?
হ্যাঁ। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে আবার দুধের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
মানসিক চাপ কি বুকের দুধ কমিয়ে দেয়?
হ্যাঁ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ অক্সিটোসিন হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে দুধ বের হওয়া কমে যেতে পারে।
ফর্মুলা দুধ দিলে কি বুকের দুধ কমে যায়?
প্রয়োজন ছাড়া নিয়মিত ফর্মুলা দুধ দিলে শিশু বুকের দুধ কম পান করে। এতে সময়ের সঙ্গে বুকের দুধ উৎপাদনও কমে যেতে পারে।
বুকের দুধ বাড়াতে ওষুধ খাওয়া কি নিরাপদ?
শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজন হলে ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া নিরাপদ নয়।
রাতে বুকের দুধ খাওয়ানো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাতের সময় প্রোল্যাকটিন হরমোনের কার্যকারিতা বেশি থাকে। তাই রাতে বুকের দুধ খাওয়ালে দুধ উৎপাদন বাড়তে সাহায্য করে।
উপসংহার
বুকের দুধ শুকিয়ে যায় কেন, এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো কারণে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুকে কম বুকের দুধ খাওয়ানো, ভুলভাবে দুধ খাওয়ানো, মানসিক চাপ, অপুষ্টি, পর্যাপ্ত পানি না পান করা এবং বিশ্রামের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে বুকের দুধের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক নিয়ম মেনে শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো, মায়ের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তাই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।


