প্রসাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর একটি সমস্যা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ডিশুরিয়া বলা হয়। তবে এটি নিজে কোনো রোগ নয়, বরং শরীরে থাকা অন্য একটি সমস্যার লক্ষণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূত্রনালীর সংক্রমণ, কিডনির সমস্যা, যৌনবাহিত সংক্রমণ অথবা মূত্রাশয়ের প্রদাহের কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়।
যদি প্রসাবের জ্বালাপোড়া একদিনের বেশি স্থায়ী হয়, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যায়, জ্বর আসে বা কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কী?
প্রসাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা অস্বস্তি অনুভব করাকে প্রসাবের জ্বালাপোড়া বলা হয়। চিকিৎসা পরিভাষায় এর নাম ডিশুরিয়া। এই সমস্যা নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে নারীদের মূত্রনালী তুলনামূলক ছোট হওয়ায় তাদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ বেশি হয় এবং সে কারণে এই সমস্যাও বেশি দেখা যায়।

অনেকেই মনে করেন প্রসাবে জ্বালাপোড়া মানেই ইউরিন ইনফেকশন। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। কিডনিতে পাথর, প্রোস্টেটের সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ত্বকের অ্যালার্জি কিংবা যৌনবাহিত সংক্রমণ থেকেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রসাবের জ্বালাপোড়ার সাধারণ লক্ষণ
প্রসাবের জ্বালাপোড়ার সঙ্গে একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। উপসর্গের ধরন অনেক সময় রোগের কারণ সম্পর্কে ধারণা দেয়।
প্রসাব করার সময় জ্বালাপোড়া
এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। প্রস্রাব শুরু করার সময়, মাঝখানে অথবা শেষের দিকে জ্বালাপোড়া অনুভূত হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে হালকা অস্বস্তি হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ
অল্প অল্প প্রস্রাব হলেও বারবার টয়লেটে যাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে। এটি সাধারণত মূত্রনালীর সংক্রমণ বা মূত্রাশয়ের প্রদাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
প্রস্রাবে রক্ত বা অস্বাভাবিক রঙ
কখনও প্রস্রাব গোলাপি, লালচে বা বাদামি রঙের হতে পারে। এটি কিডনির পাথর, সংক্রমণ বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।
দুর্গন্ধযুক্ত বা ঘোলা প্রস্রাব
প্রস্রাবে দুর্গন্ধ, ঘোলা ভাব বা পুঁজের মতো উপাদান থাকলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
তলপেট বা কোমরে ব্যথা
অনেক সময় প্রসাবের জ্বালাপোড়ার পাশাপাশি তলপেট, কোমর বা কিডনির পাশে ব্যথা অনুভূত হয়। সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে এই ধরনের ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কেন হয়?
প্রসাবের জ্বালাপোড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সঠিক কারণ নির্ণয় না করে শুধু ব্যথার ওষুধ খাওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মূত্রনালীর সংক্রমণ
মূত্রনালীর সংক্রমণ এই সমস্যার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী দিয়ে মূত্রাশয়ে প্রবেশ করলে সংক্রমণ তৈরি হয়। এতে প্রসাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব দেখা দিতে পারে।
কিডনিতে পাথর
কিডনিতে পাথর তৈরি হলে তা মূত্রনালীর ভেতর দিয়ে নামার সময় তীব্র ব্যথা ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তও বের হয়।
যৌনবাহিত সংক্রমণ
গনোরিয়া, ক্ল্যামিডিয়া, হারপিসসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত সংক্রমণের কারণে প্রসাবের সময় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া হতে পারে। এ ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
মূত্রাশয়ের প্রদাহ
মূত্রাশয়ের ভেতরের আস্তরণে প্রদাহ হলে প্রসাবের সময় অস্বস্তি, তলপেটে ব্যথা এবং ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রবণতা দেখা যায়।
প্রোস্টেট গ্রন্থির সমস্যা
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থি ফুলে গেলে বা সংক্রমণ হলে প্রসাব করতে কষ্ট হয়। একই সঙ্গে জ্বালাপোড়া, ব্যথা এবং প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যান্সারের ওষুধ বা অন্য কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও প্রসাবের সময় জ্বালাপোড়া হতে পারে।
রাসায়নিক উপাদানের অ্যালার্জি
সুগন্ধিযুক্ত সাবান, ফোম বাথ, স্প্রে, লোশন বা অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য অনেকের ক্ষেত্রে মূত্রনালীর চারপাশে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন?
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রসাবের জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি।
- নারীরা
- গর্ভবতী নারী
- ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
- যাদের আগে ইউরিন ইনফেকশন হয়েছে
- কিডনিতে পাথরের রোগী
- প্রোস্টেট সমস্যায় ভোগা পুরুষ
- নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ না করা ব্যক্তি
- পর্যাপ্ত পানি পান করেন না যারা
- দীর্ঘদিন ক্যাথেটার ব্যবহার করছেন এমন রোগী
এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
প্রসাবের জ্বালাপোড়া একটি উপসর্গ। তাই শুধু উপসর্গ দেখে ওষুধ শুরু না করে এর মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক অবস্থা, পূর্বের রোগের ইতিহাস এবং বর্তমান উপসর্গ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান।
কতদিন ধরে সমস্যা হচ্ছে, প্রস্রাবে রক্ত আছে কি না, জ্বর বা কোমরে ব্যথা আছে কি না, যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে কি না, এসব তথ্য রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক এক বা একাধিক পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ইউরিন রুটিন পরীক্ষা
এটি সবচেয়ে প্রচলিত পরীক্ষা। এতে প্রস্রাবে রক্ত, পুঁজ, প্রোটিন, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অস্বাভাবিক উপাদান আছে কি না তা জানা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার মাধ্যমেই সংক্রমণের প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ইউরিন কালচার
যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের সন্দেহ থাকে, তাহলে ইউরিন কালচার করা হয়। এই পরীক্ষায় কোন জীবাণুর কারণে সংক্রমণ হয়েছে এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক সবচেয়ে কার্যকর হবে তা নির্ধারণ করা যায়।
রক্ত পরীক্ষা
সংক্রমণের মাত্রা, কিডনির কার্যকারিতা এবং শরীরে প্রদাহের অবস্থা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
আল্ট্রাসোনোগ্রাম
কিডনিতে পাথর, মূত্রাশয়ের সমস্যা, প্রস্রাব আটকে থাকা বা অন্য কোনো গঠনগত পরিবর্তন আছে কি না তা জানতে আল্ট্রাসোনোগ্রাম করা হতে পারে।
সিস্টোস্কোপি
দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে বা অন্য পরীক্ষায় কারণ স্পষ্ট না হলে সিস্টোস্কোপি করা হয়। এতে একটি সরু ক্যামেরার সাহায্যে মূত্রনালীর ভেতরের অংশ সরাসরি দেখা সম্ভব হয়।
যৌনবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা
যদি গনোরিয়া, ক্ল্যামিডিয়া বা অন্য কোনো যৌনবাহিত সংক্রমণের লক্ষণ থাকে, তাহলে চিকিৎসক বিশেষ পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রসাবের জ্বালাপোড়ার চিকিৎসা
চিকিৎসা সব সময় সমস্যার মূল কারণের ওপর নির্ভর করে। তাই নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। ভুল ওষুধ সংক্রমণ আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা
মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে চিকিৎসক সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দেন। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ওষুধ সম্পূর্ণ খাওয়া জরুরি। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে সংক্রমণ আবার ফিরে আসতে পারে।
ব্যথা ও জ্বালাপোড়া কমানোর ওষুধ
প্রস্রাবের সময় অতিরিক্ত ব্যথা বা জ্বালাপোড়া থাকলে চিকিৎসক ব্যথা কমানোর জন্য বিশেষ ওষুধ দিতে পারেন। এগুলো শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।
কিডনির পাথরের চিকিৎসা
ছোট পাথর অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পান করলে নিজে থেকেই বের হয়ে যায়। তবে বড় পাথরের ক্ষেত্রে ওষুধ, লেজার চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রোস্টেটের সমস্যার চিকিৎসা
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে বা সংক্রমণ হলে বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হতে পারে।
যৌনবাহিত সংক্রমণের চিকিৎসা
এসটিআই ধরা পড়লে রোগী ও তার যৌনসঙ্গী উভয়ের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ যৌন আচরণ অনুসরণ করা জরুরি।
ঘরোয়া উপায়ে প্রসাবের জ্বালাপোড়া কমানোর উপায়
ঘরোয়া কিছু অভ্যাস উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং মূত্রনালী থেকে জীবাণু বের হতে সাহায্য করে। এটি সংক্রমণের ঝুঁকিও কমায়।
প্রস্রাব চেপে রাখবেন না
অনেকেই দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখেন। এতে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করার সুযোগ পায়। তাই প্রস্রাবের চাপ অনুভব করলে যত দ্রুত সম্ভব টয়লেটে যাওয়া উচিত।
ক্যাফেইন ও ঝাল খাবার কম খান
চা, কফি, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত ঝাল ও টক খাবার অনেকের মূত্রাশয়ে জ্বালাপোড়া বাড়িয়ে দিতে পারে। সমস্যা থাকলে কয়েকদিন এসব খাবার কম খাওয়া ভালো।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
যৌনাঙ্গ পরিষ্কার রাখা এবং প্রতিদিন পরিষ্কার ও শুকনো অন্তর্বাস ব্যবহার করা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
সহবাসের পর প্রস্রাব করুন
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সহবাসের পর প্রস্রাব করলে মূত্রনালীতে প্রবেশ করা জীবাণু বের হয়ে যেতে পারে। এতে ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি কমে।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া প্রতিরোধের উপায়
সুস্থ জীবনযাপন এবং কিছু সাধারণ অভ্যাস অনুসরণ করলে এই সমস্যা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরে পানির ঘাটতি হলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায় এবং মূত্রনালীতে জ্বালাপোড়া বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত।
নিরাপদ যৌন অভ্যাস অনুসরণ করুন
যৌনবাহিত সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে নিরাপদ যৌন আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
সুগন্ধিযুক্ত পণ্য ব্যবহার কমান
সুগন্ধিযুক্ত সাবান, স্প্রে বা অন্যান্য রাসায়নিক পণ্য অনেকের ত্বকে অ্যালার্জি ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রয়োজনে মৃদু ও সুগন্ধিবিহীন পণ্য ব্যবহার করুন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান
সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
প্রসাবের সময় হালকা জ্বালাপোড়া অনেক সময় সাময়িক কারণে হতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব এবং কিডনি বা মূত্রতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকিও কমে।
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
- প্রসাবের জ্বালাপোড়া ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে
- প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে
- জ্বর, কাঁপুনি বা শরীর ব্যথা থাকলে
- কোমর বা পিঠের নিচের অংশে তীব্র ব্যথা হলে
- গর্ভাবস্থায় প্রসাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হলে
- বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ হলে
- প্রসাব করতে খুব বেশি কষ্ট হলে অথবা প্রসাব একেবারেই না হলে
এসব উপসর্গ কিডনির সংক্রমণ, কিডনিতে পাথর বা অন্য কোনো গুরুতর রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। তাই নিজে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
নারীদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে কি প্রসাবের জ্বালাপোড়া কম হয়?
প্রসাবের জ্বালাপোড়া নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে নারীদের মূত্রনালী ছোট হওয়ায় ব্যাকটেরিয়া সহজে মূত্রাশয়ে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে নারীদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং প্রসাবের জ্বালাপোড়ার হার তুলনামূলক বেশি।
অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ, প্রোস্টেট বড় হয়ে যাওয়া, যৌনবাহিত সংক্রমণ অথবা কিডনির পাথর এই সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তাই নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে কারণ আলাদা হলেও সঠিক পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া হলে যা করা উচিত
প্রসাবের সময় জ্বালাপোড়া শুরু হলে কিছু সহজ নিয়ম অনুসরণ করলে উপসর্গ কিছুটা কমতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন।
- প্রসাব চেপে রাখবেন না।
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
- সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা রাসায়নিক পণ্য ব্যবহার কমান।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না।
- বারবার সমস্যা হলে অবশ্যই ইউরিন পরীক্ষা করান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কেন হয়?
সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো মূত্রনালীর সংক্রমণ। এছাড়া কিডনিতে পাথর, মূত্রাশয়ের প্রদাহ, প্রোস্টেটের সমস্যা, যৌনবাহিত সংক্রমণ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কত দিনে ভালো হয়?
যদি সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয় এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণত ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে উপসর্গ কমতে শুরু করে। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের পুরো কোর্স শেষ করা জরুরি।
বেশি পানি পান করলে কি প্রসাবের জ্বালাপোড়া কমে?
পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাব পাতলা হয় এবং মূত্রনালী পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এতে হালকা সংক্রমণ বা জ্বালাপোড়ার উপসর্গ কিছুটা কমতে পারে। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
প্রসাবের জ্বালাপোড়া কি কিডনির রোগের লক্ষণ?
হতে পারে। বিশেষ করে যদি জ্বর, কোমরে ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত বা বমি বমি ভাব থাকে, তাহলে এটি কিডনির সংক্রমণ বা কিডনিতে পাথরের লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
ঘরোয়া উপায়ে কি প্রসাবের জ্বালাপোড়া সম্পূর্ণ ভালো হয়?
হালকা অস্বস্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি পান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মূত্রাশয়কে উত্তেজিত করে এমন খাবার এড়িয়ে চললে কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে সংক্রমণ বা অন্য কোনো রোগ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।
উপসংহার
প্রসাবের জ্বালাপোড়া একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলা করার মতো সমস্যা নয়। এটি অনেক সময় মূত্রনালীর সংক্রমণের মতো সহজ কারণে হলেও কিডনির পাথর, প্রোস্টেটের সমস্যা বা যৌনবাহিত সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগেরও লক্ষণ হতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে কারণ শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত পানি পান করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিরাপদ যৌন অভ্যাস অনুসরণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ না করা এই সমস্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদি জ্বালাপোড়ার সঙ্গে জ্বর, প্রস্রাবে রক্ত, কোমরে ব্যথা বা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকে, তাহলে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


