আমাদের শরীরের একটা স্বাভাবিক তাপমাত্রা আছে, যা সাধারণত ৩৬.৫ থেকে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৯৭ থেকে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট) হয়ে থাকে। যখন শরীর এই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে না এবং নিজেকে ঠান্ডা করতে ব্যর্থ হয়, তখন শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়।
একে আমরা তাপ চাপ বা হিট স্ট্রেসও বলি। এই পরিস্থিতিতে একটি সাধারণ প্রশ্ন ওঠে – কীভাবে শরীরের তাপ কমানো যায়? এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানব শরীর গরম থাকা কিসের লক্ষণ, এর কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, টাইট পোশাক, বেশিক্ষণ রোদে থাকা, কঠিন শারীরিক পরিশ্রম এবং কিছু অসুস্থতার কারণে শরীরের তাপ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে আমরা প্রায়শই ক্লান্তি, অতিরিক্ত ঘাম, মাংসপেশিতে টান, মাথাব্যথা, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং সাধারণ দুর্বলতা অনুভব করি।
এছাড়াও, শরীর গরম হলে ডিহাইড্রেশন বা জলশূন্যতা দেখা দেয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে ঢিলেঢালা পোশাক পরা, ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় থাকা এবং মাঝে মাঝে ঠান্ডা পানিতে গোসল করা খুবই উপকারী।
শরীর গরম থাকা কিসের লক্ষণ?
যদি আপনার শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভব হয়, তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শরীর গরম থাকা কিসের লক্ষণ তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অতিরিক্ত ঘাম: শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টায় বেশি ঘামতে শুরু করে।
- মাথাব্যথা: তাপমাত্রা বাড়লে মাথাব্যথা হতে পারে।
- পেশীতে খিঁচুনি বা টান: গরমে পেশী ক্লান্ত হয়ে টান ধরতে পারে।
- দুর্বলতা ও অলসতা: শরীর গরম হলে আপনি ক্লান্ত এবং দুর্বল বোধ করতে পারেন।
- দ্রুত হৃদস্পন্দন: শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে।
- ডিহাইড্রেশন: শরীর থেকে জলীয় অংশ কমে যাওয়ায় জলশূন্যতা দেখা দেয়।
- মাথা ঘোরা: গরমে অনেকের মাথা ঘুরতে পারে।
- বমি বমি ভাব: অতিরিক্ত গরমে বমি ভাবও হতে পারে।

শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ
বিভিন্ন কারণে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তেমন কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. সংক্রমণ ও প্রদাহ: শরীরে কোনো ইনফেকশন হলে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার ফলে জ্বর আসতে পারে এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
২. হাইপারথাইরয়েডিজম: এই সমস্যায় থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে, ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
৩. আর্দ্র আবহাওয়া: গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
৪. কঠোর শারীরিক পরিশ্রম: বেশি ব্যায়াম বা খাটুনি করলে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।
৫. সরাসরি সূর্যের আলো: বেশিক্ষণ রোদে থাকলে শরীরে জলের পরিমাণ কমে যায়, যা ক্লান্তি বাড়ায় এবং শরীরের তাপ বাড়ায়।
৬. আঁটসাঁট পোশাক: সিনথেটিক বা খুব টাইট পোশাক পরলে বাতাস চলাচল করতে পারে না, ফলে শরীর গরম হয়ে অস্বস্তি লাগে।
৭. খাবার: অতিরিক্ত তৈলাক্ত, মশলাদার বা উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার (যেমন বাদাম, মাংস) বেশি খেলে শরীরের তাপ বাড়তে পারে।
৮. অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন: বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল বা ক্যাফেইন পান করলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
৯. কিছু রোগ: লিউকেমিয়া, আর্থ্রাইটিস এবং কিছু স্নায়বিক রোগ শরীরের তাপমাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
১০. ওষুধ: কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক এবং অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ শরীরের তাপমাত্রা বাড়াতে পারে।
১১. ডিহাইড্রেশন: শরীরে জলের অভাব হলে ঘাম কম হয়, ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে না এবং তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণগুলো তো জানা গেল। এবার চলুন জেনে নিই, কীভাবে শরীরের তাপ কমানো যায়!
শরীরের তাপ কমানোর ১১টি কার্যকরী উপায়
নিচে দেওয়া ১১টি টিপসের সাহায্যে আপনি সহজেই শরীরের তাপ কমাতে পারবেন:
১. ডাবের জল: শরীরকে ঠান্ডা এবং রিহাইড্রেট করার জন্য ডাবের জল খুবই উপকারী। এতে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও ইলেক্ট্রোলাইট ডিহাইড্রেশন কমায় এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে। গরমে দিনে কয়েকবার ডাবের জল পান করতে পারেন।
২. লেবু জল: লেবুতে থাকা ভিটামিন সি শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে এবং গরমে সতেজ অনুভূতি দেয়। এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে।
৩. পুদিনা পাতা (মেন্থল): পুদিনা পাতায় থাকা মেন্থল শরীরকে ঠান্ডা করে। পুদিনা পাতার শরবত বানিয়ে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা ঠান্ডা পান করতে পারেন।
৪. জলীয় ফল ও সবজি: শসা, তরমুজ, ফুটি, স্ট্রবেরি, সেলারি, ফুলকপি ইত্যাদি ফল ও সবজিতে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। দইও শরীর ঠান্ডা রাখে; বরফ মিশিয়ে স্মুদি বানিয়ে খেতে পারেন।
৫. ঘোল: ঘোল বা বাটারমিল্ক শরীর থেকে তাপ দূর করতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি বেশি বা যারা গরম ঝলকানি (hot flashes) অনুভব করেন। এটি ঘামের কারণে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া ভিটামিন ও খনিজ পূরণ করে।
৬. মেথি: গরমে মেথি চা পান করলে ঘাম হয়, যা শরীরকে ঠান্ডা করতে সাহায্য করে। মেথি চা বানিয়ে ঠান্ডা করে পান করতে পারেন। এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করে দিতেও সাহায্য করে।
৭. হালকা পোশাক: গরমে হালকা রঙের, ঢিলেঢালা এবং সুতির বা লিনেন কাপড়ের পোশাক পরুন। রোদে বের হলে চওড়া টুপি, সানগ্লাস ব্যবহার করুন এবং ছাতা নিন।
৮. মরিচ/ঝাল খাবার: অবাক লাগলেও সত্যি যে, ঝাল খাবার শরীরকে ঠান্ডা করতে পারে। মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠায় যে শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে। ফলে শরীর বেশি ঘামে এবং তাপমাত্রা কমে।
৯. অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরার ভেতরের জেল ত্বকে লাগালে ঠান্ডা অনুভূতি হয়। এটি ত্বকে লাগিয়ে কয়েক মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। আরও ভালো ফল পেতে ব্যবহারের আগে ফ্রিজে রাখতে পারেন। অ্যালোভেরার রস বা স্মুদিও খাওয়া যেতে পারে।
১০. যোগ ব্যায়াম: যোগাসন শরীর ও মন দুটোই ঠান্ডা করতে সাহায্য করে।
- আরাম করে বসুন।
- জিভ বের করে নলের মতো গোল করুন (যদি না পারেন, ঠোঁট গোল করুন)।
- মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিন।
- নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন।
- এই প্রক্রিয়াটি ৫ মিনিট পর্যন্ত করুন।
১১. ডাক্তারের পরামর্শ নিন: যদি আপনার থাইরয়েডের সমস্যা থাকে, তবে শরীর অতিরিক্ত গরম লাগতে পারে। এক্ষেত্রে ঘাম, দ্রুত হৃদস্পন্দন, জন্ডিস বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
বিভিন্ন বয়সের মানুষের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রা
| জনসংখ্যার উপাত্ত | তাপমাত্রা সীমা |
| প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (বিশ্রামের সময়) | ৩৬.২৪ থেকে ৩৭ °সে (৯৭.২–৯৮.৬ °ফা) এর মধ্যে |
| প্রাপ্তবয়স্কদের হালকা জ্বর | ৩৮ ° সে (১০০.৪ ° ফা) |
| প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ জ্বর | ৩৯.৫ ° সে (১০৩.১ ° ফা) |
| শিশুদের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (বিশ্রামের সময়) | ৩৭.৫ ° সে (৯৯.৫ ° ফা) |
| গর্ভবতী মহিলা (গর্ভাবস্থার ১২ তম সপ্তাহের কাছাকাছি) | ৩৫.৬ °সে থেকে ৩৭.৫ °সে (৯৬ – ৯৯.৫ °ফা) |
| গর্ভবতী মহিলা (গর্ভাবস্থার ৩৩ তম সপ্তাহের কাছাকাছি) | ৩৫.৩ °সে থেকে ৩৭.৩ °সে (৯৫.৫ – ৯৯.১ °ফা) |
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
- যদি আপনার শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ºF (৩৯.৪ºC) বা তার বেশি হয়, তবে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর শরীরের তাপমাত্রা (মলদ্বার দিয়ে মাপা) ১০০.৪ºF (৩৮ºC) বা তার বেশি হলে ডাক্তার দেখান।
- ৩ মাসের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে, ১০২.২ºF (৩৯ºC) তাপমাত্রা বা ২৪ ঘণ্টার বেশি জ্বর থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এছাড়াও, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সাথে যদি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন:
- শ্বাসকষ্ট
- বিরক্তি, তন্দ্রা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা
- ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
- আলোতে তাকাতে সমস্যা
- বমি
- তরল খাবার খেতে না চাওয়া বা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ
- শরীরে ফুসকুড়ি বা সংক্রমণের লক্ষণ
উপসংহার
যদি আপনি শরীরের অতিরিক্ত তাপ অনুভব করেন, তবে ওপরে বলা ঘরোয়া উপায়গুলো চেষ্টা করতে পারেন। তবে, যদি ঘরোয়া প্রতিকারের পরেও আপনার শরীরের তাপমাত্রা না কমে, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে অনেক জটিলতা এড়ানো যায়।
প্রশ্নাবলী (FAQs)
১) অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকিতে কারা?
- যারা গরম আবহাওয়ায় ব্যায়াম করেন (ক্রীড়াবিদ)।
- বয়স্ক ব্যক্তিরা।
- শিশু এবং ছোট বাচ্চারা।
- যাদের কিছু বিশেষ শারীরিক অবস্থা রয়েছে, যেমন – স্থূলতা বা হৃদরোগ।
২) কোন খাবার শরীরের তাপ কমায়?
- শসা
- তরমুজ
- ডাবের জল
- পুদিনা
- দই
৩) কখন আমার শরীরের অতিরিক্ত তাপ নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত?
যদি আপনি নিচের লক্ষণগুলো অনুভব করেন, তবে চিন্তিত হওয়া উচিত:
- মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব।
- পেশীতে টান বা খিঁচুনি।
- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া অথবা একেবারেই ঘাম না হওয়া।
- বমি বমি ভাব।
- দ্রুত হৃদস্পন্দন।
৪) শরীরে তাপ কিসের কারণে হয়?
শরীরে তাপ মূলত উৎপন্ন হয়:
- শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের ফলে।
- বিপাক ক্রিয়ার (খাবার হজম ও শক্তি উৎপাদন) ফলে।
- বাইরের তাপ উৎস (যেমন গরম আবহাওয়া বা সনা) থেকে।
৫) কোন পানীয় শরীরের তাপ দূর করে?
শরীর ঠান্ডা করতে সাহায্য করে এমন কিছু পানীয় হলো:
- সাধারণ জল
- বিভিন্ন ভেষজ চা (যেমন পুদিনা বা ক্যামোমাইল চা)
- ডাবের জল
- অ্যালোভেরার রস
৬) আমার শরীর গরম কিন্তু জ্বর নেই কেন?
জ্বর ছাড়া শরীর গরম লাগার কিছু সম্ভাব্য কারণ:
- হরমোনের পরিবর্তন (যেমন মেনোপজের সময়)।
- মানসিক চাপ বা উদ্বেগ।
- এমন কোনো ওষুধ সেবন যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে।
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম।


