প্রতি বছর রমজান মাস শুরুর আগে মুসলিম বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে? ২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন চাঁদ দেখা যাবে কি না, দাপ্তরিক হিজরি ক্যালেন্ডার কী বলছে, আর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কী পূর্বাভাস দিচ্ছেন—সবকিছু মিলিয়ে এবারও আলোচনা ও বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই বিষয়টি।
চাঁদ দেখার আহ্বান ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা
সৌদি আরব-এ রমজান শুরুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট প্রতি বছর শাবান মাসের ২৯ তারিখে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায়—খালি চোখে বা দূরবীন দিয়ে পশ্চিম আকাশে নতুন চাঁদ দেখার চেষ্টা করতে।
যদি ওই দিন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পরদিন থেকেই রমজান মাস শুরু হয়। আর যদি চাঁদ দেখা না যায়, তবে শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে তার পরদিন থেকে রোজা শুরু হয়।
এই প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে।

উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডার কী বলছে?
সৌদি আরবের দাপ্তরিক হিজরি বর্ষপঞ্জি হলো ‘উম্ম আল-কুরা’। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৬ সালে সম্ভাব্যভাবে বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজানের প্রথম দিন হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডার একটি পূর্বনির্ধারিত হিসাবভিত্তিক পঞ্জিকা। চূড়ান্ত ঘোষণা সবসময় চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই দেওয়া হয়। তাই প্রশ্নটি—সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে—এর নিশ্চিত উত্তর মিলবে চাঁদ দেখার পরই।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতামত
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা এবং ব্রিটিশ সংগঠন Crescent Moon Watch–এর তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কায় সূর্যাস্তের কয়েক মিনিটের মধ্যেই চাঁদ অস্ত যেতে পারে।
অর্থাৎ, সূর্যাস্তের পর আকাশ যথেষ্ট অন্ধকার হওয়ার আগেই যদি চাঁদ ডুবে যায়, তাহলে খালি চোখে চাঁদ দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সাধারণত ৪৫ মিনিটের বেশি সময় ব্যবধান থাকলে চাঁদ দেখার সম্ভাবনা বাড়ে। যদি সময় কম হয়, তাহলে সৌদি আরবে রোজা একদিন পিছিয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্য দুইটি তারিখ
বর্তমান বিশ্লেষণ অনুযায়ী সম্ভাব্য দুটি পরিস্থিতি হতে পারে:
পরিস্থিতি ১: মঙ্গলবার চাঁদ দেখা গেলে
- বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে রমজান শুরু
- অর্থাৎ বুধবারই প্রথম রোজা
পরিস্থিতি ২: চাঁদ দেখা না গেলে
- শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে
- বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে রমজান শুরু
এই দুই সম্ভাবনার মাঝেই নির্ধারিত হবে সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে।
কেন বিতর্ক তৈরি হয়?
গত কয়েক বছরে একাধিকবার এমন হয়েছে, যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন চাঁদ দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু সৌদি আরবে চাঁদ দেখার ঘোষণা এসেছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঈদের তারিখ নিয়েও একই ধরনের আলোচনা হয়েছিল। তখন কুয়েত ও অন্যান্য দেশের জ্যোতির্বিদরা আপত্তি তুললেও সৌদি কর্তৃপক্ষ সাক্ষ্য গ্রহণের ভিত্তিতে ঘোষণা দেয়।
সমালোচকদের মতে, অনেক সময় ঘোষণা উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলে যায়। আবার সমর্থকদের মতে, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যই চূড়ান্ত।
অন্যান্য দেশের অবস্থান
তুরস্ক
তুরস্ক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনার ভিত্তিতে আগেভাগেই রমজানের তারিখ ঘোষণা করে। তারা সরাসরি চাঁদ দেখার দাবি করে না।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ
উত্তর আমেরিকার কিছু ইসলামিক সংস্থা হিসাবভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। যুক্তরাজ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি না থাকায় অনেকেই সৌদির অনুসরণ করেন।
বাংলাদেশ
বাংলাদেশ সাধারণত সৌদি আরবের একদিন পর রোজা শুরু করে। তাই সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে—এটি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যদি সৌদিতে বুধবার শুরু হয়, তবে বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার রোজা শুরু হতে পারে। আর যদি সৌদিতে বৃহস্পতিবার শুরু হয়, তবে বাংলাদেশে শুক্রবার প্রথম রোজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে?
সব তথ্য ও বিশ্লেষণ বিবেচনায় বলা যায়:
- দাপ্তরিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সম্ভাব্য তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা অনুযায়ী চাঁদ দেখা কঠিন হতে পারে
- ফলে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও জোরালো
অতএব, সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে—এর নির্ভরযোগ্য ও চূড়ান্ত উত্তর মিলবে শাবান মাসের ২৯ তারিখে মাগরিবের পর চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে।
প্রশ্নোত্তর
সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে?
সম্ভাব্যভাবে ১৮ ফেব্রুয়ারি বা ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
উম্ম আল-কুরা ক্যালেন্ডার কি চূড়ান্ত?
না। এটি পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডার। চূড়ান্ত ঘোষণা চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কেন ভিন্নমত দেন?
তারা সূর্য–চাঁদের অবস্থান ও সময় ব্যবধান বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনা নির্ধারণ করেন। কখনও বাস্তব সাক্ষ্যের সঙ্গে তা না মিললে বিতর্ক তৈরি হয়।
বাংলাদেশে কবে রোজা শুরু হতে পারে?
সাধারণত সৌদি আরবের একদিন পর। তাই সৌদিতে যে দিন শুরু হবে, তার পরদিন বাংলাদেশে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
চাঁদ না দেখা গেলে কী হয়?
শাবান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে তার পরদিন রমজান শুরু হয়।
উপসংহার
সৌদি আরবে রোজা ২০২৬ কবে শুরু হবে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো সম্ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ক্যালেন্ডার, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রত্যক্ষ চাঁদ দেখার সাক্ষ্য—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পবিত্র মাহে রমজানের আগমনের জন্য—যা আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও সংযমের এক মহিমান্বিত সময়।


